
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নে তিন ফসলি জমি কেটে পুকুর তৈরির এক আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কৃষি জমি রক্ষায় সরকারি কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও প্রভাবশালী চক্রের দাপটে তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এতে একদিকে যেমন আবাদি জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, অন্যদিকে হুমকিতে পড়ছে স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্য।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে মুরাদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। যেখানে কয়েক মাস আগেও সোনালী ধান কিংবা মৌসুমি সবজির সমারোহ ছিল, সেখানে এখন বিশাল বিশাল গর্ত করে পুকুর খনন করা হয়েছে। এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কেটে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক অভিযান চলাকালীন কাজ সাময়িক বন্ধ থাকলেও আড়ালে চলে গভীর রাত পর্যন্ত মাটি কাটার উৎসব।
পুকুর খননের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষক মোহাম্মদ নুরুন্নবি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার জমির চারপাশে প্রভাবশালীরা গভীর পুকুর খনন করেছে। ফলে আমার জমিতে পানি জমে থাকছে এবং পাড় ভেঙে পড়ছে। এখন আর আগের মতো ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে না।” কৃষকদের দাবি, এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরে এই এলাকায় চাষাবাদের জন্য কোনো জমি অবশিষ্ট থাকবে না।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কৃষি জমি কোনোভাবেই অকৃষি কাজে বা পুকুর খননে ব্যবহার করা যাবে না। ‘বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এবং ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন’ অনুযায়ী এটি একটি গুরুতর অপরাধ।
পুকুর কাটার অপরাধ ও সংশ্লিষ্ট ধারা:
*বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (ধারা ১৫): অনুমতি ব্যতীত কৃষি জমি থেকে মাটি কাটা বা ড্রেজিং করার ফলে জমির ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনূর্ধ্ব ২ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত ২০১০):
প্রাকৃতিক জলাধার বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা আইনত নিষিদ্ধ। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন করলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
ধারা ৩ (কৃষি জমি সুরক্ষা আইন):
কোনো ব্যক্তি কৃষি জমি শিল্প স্থাপন, ইমারত নির্মাণ বা অন্য কোনো অকৃষি কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না। করলে উক্ত জমি বাজেয়াপ্তসহ জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষি জমি সংরক্ষণে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। যারা নিয়ম না মেনে পুকুর খনন করছে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দায়সারা অভিযান নয় বরং স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করলে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয় এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরে পরিবর্তন আসে। এটি দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় ইকো-সিস্টেমের জন্য বড় হুমকি।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারির পর মুরাদপুরের ফসলি জমিতে মাটি কাটার এই ধ্বংসলীলা বন্ধ হয় কি না, নাকি কৃষি জমি কেবল মানচিত্রের অংশ হয়েই থেকে যাবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;