
চট্টগ্রামে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র এবং ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ দখল করে মাসব্যাপী মেলা আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। রেলওয়ের শহীদ শাহজাহান মাঠ ও পলোগ্রাউন্ড—মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাঠে এই মেলার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। সরকারের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এই মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরীক্ষা কেন্দ্রের পাশে মেলার শব্দ ও যানজট আতঙ্ক:
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাহাড়তলী রেলওয়ে হাই স্কুলের পাশের শহীদ শাহজাহান মাঠে ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা’র ব্যানারে মেলার প্রস্তুতি চলছে এবং পুরো মাঠজুড়ে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্কুলের মাত্র ১০০ গজের মধ্যে রয়েছে রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র। আগামী ২১ এপ্রিল থেকে এখানে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মেলা চলাকালে তীব্র শব্দদূষণ, অতিরিক্ত জনসমাগম ও মেলা প্রাঙ্গণে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পুরো এলাকায় ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হবে। এতে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে যেমন ভোগান্তি পোহাতে হবে, তেমনি মেলার উচ্চশব্দে বিঘ্নিত হবে পরীক্ষার পরিবেশ।
একই চিত্র দেখা গেছে পলোগ্রাউন্ড মাঠেও। সেখানে ‘চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার বড় ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পলোগ্রাউন্ড মাঠের পাশেই রয়েছে আরেকটি পরীক্ষা কেন্দ্র—রেলওয়ে পাবলিক হাই স্কুল।
পাহাড়তলী রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমেনা বেমম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "২১ এপ্রিল থেকে আমার ছেলের এসএসসি পরীক্ষা। এই সময়ে যদি মেলার মাইক আর মানুষের চিল্লাচিল্লি চলে, তবে ও পড়াশোনায় মন দেবে কীভাবে? মেলা তো অন্য জায়গায় বা অন্য সময়েও হতে পারত। পরীক্ষা কেন্দ্রের এত কাছে মেলার অনুমতি যারা দিয়েছে, তারা কি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা একবারও ভাবেনি?"
আরেকজন অভিভাবক জানান, "মেলার কারণে রাস্তায় যে জটলা হবে, তাতে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা প্রশাসনের কাছে এই মেলা বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি।"
মাঠ নিয়ে রেলওয়ের রশি টানাটানি:
রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে একই সাথে দুটি মাঠে এই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। শহীদ শাহজাহান মাঠ ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেলওয়ের ডিআরএম ও স্পোর্টস এসোসিয়েশনের আহবায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইঞা জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি অনুযায়ী তারা মাঠ ভাড়া দিয়েছেন।
তবে ভিন্ন সুর শোনা গেছে বিভাগীয় প্রকৌশলী ও স্পোর্টস এসোসিয়েশনের সচিব আবু রাফি মো. ইমতিয়াজ হোসাইনের কণ্ঠে। তিনি জানান, মেলার জন্য প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হলেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। চুক্তি ছাড়া কাজ চললে যেকোনো সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হতে পারে। অন্যদিকে, পলোগ্রাউন্ড মাঠটি উইমেন চেম্বারকে ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম।
নীতিমালা ও সরকারি নির্দেশনার লঙ্ঘন:
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মোবাইল আসক্তি ও মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সরকার যখন খেলার মাঠ উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিচ্ছে, তখন এই ধরনের মেলা আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ শিক্ষকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, "খেলার সুযোগ না থাকলে তরুণরা বিপথে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে মাঠ সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি।"
উল্লেখ্য, গত ২৪ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক পরিপত্রের মাধ্যমে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ সংরক্ষণ এবং ছুটির দিনেও তা উন্মুক্ত রাখার জন্য বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কড়া নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার সন্ধ্যা ৬টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন সংকটের মধ্যে মাসব্যাপী মেলার আয়োজনকে কোনোভাবেই যৌক্তিক মনে করছেন না সচেতন মহল।
সিএমপি কমিশনারের আশ্বাস:
পরীক্ষা কেন্দ্র এবং খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "খেলার মাঠে কোনো মেলা হবে না। বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে নজরদারি করব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করব।"
সচেতন মহলের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে প্রশাসন দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;