
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কৌশলগত গুরুত্ব, শিল্পাঞ্চল, দেশের একমাত্র জাহাজভাঙা শিল্প এবং পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা জনপদ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম নগরীর আকবরশাহ-পাহাড়তলী আংশিক) আসনটি শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যারোমিটার হিসেবেই পরিচিত। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিতর্কিত নির্বাচনগুলো বাদ দিলে ১৯৭০ সাল থেকে এই আসনে যে দল জয়লাভ করেছে, রাষ্ট্রক্ষমতাতেও সেই দলই অধিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও চট্টগ্রাম-৪ ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর বাড়তি নজর স্বাভাবিক।
প্রার্থী সংখ্যা ৯, কিন্তু লড়াই মূলত দুই শিবিরে
এ আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন— ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এফসিএ, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী চৌধুরী, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা কারী দিদারুল মাওলা, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের এটিএম পারভেজ, মোমবাতি প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্টের মো. সিরাজউদ্দৌলা, কাস্তে প্রতীকে সিপিবির মো. মছিউদদৌলা, একতারা প্রতীকে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির শহিদুল ইসলাম চৌধুরী, মাথাল প্রতীকে গণসংহতি আন্দোলনের জাহিদুল আলম, এবং বই প্রতীকে নেজামে ইসলাম পার্টির জাকারিয়া খালেদ।
তবে স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থী সংখ্যা যতই হোক না কেন, ভোটের মূল লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। বাকি প্রার্থীরা আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিলেও মাঠের বাস্তবতায় তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ভোটার হিসাব : তরুণ ও নীরব শক্তির গুরুত্ব
চট্টগ্রাম-৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫২ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১৩ হাজার ১৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১২ জন। উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এবার নতুন ভোটার প্রায় ২৩ হাজার, যাদের বড় অংশ তরুণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি আরেকটি বড় ফ্যাক্টর হলো আওয়ামী লীগপন্থী নীরব ভোটব্যাংক। দলটি নির্বাচনে না থাকলেও তাদের সমর্থক ভোটাররা কার দিকে ঝুঁকবেন, সেটিই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিএনপি ও জামায়াত—উভয় পক্ষই এই ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী কৌশল গ্রহণ করছে।
বিএনপি প্রার্থী : অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের জোর
ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এফসিএ সীতাকুণ্ড রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। ২০০৪ সাল থেকে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দলীয় সংগঠন গড়ে তুলতে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অতীতে জেল-জুলুম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়ায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার প্রতি সহানুভূতিও রয়েছে।
মনোনয়ন নিয়ে শুরুতে জটিলতা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে প্রার্থী করায় বিএনপির ভেতরে ঐক্য ফিরে আসে। গণসংযোগে তিনি উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার এবং শিল্প–কৃষির সমন্বয়ের কথা বলছেন। তার দাবি, সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সীতাকুণ্ড দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতে পারে।
জামায়াত প্রার্থী : শৃঙ্খলা ও মাঠের সংগঠন
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী চৌধুরী পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে এলাকায় পরিচিত। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা বর্তমানে উত্তর জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকেই তিনি প্রতিদিন উপজেলার একের পর এক এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
জামায়াতের নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত সুসংগঠিত কর্মীবাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছে, এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করছে। জামায়াত নেতাদের মতে, “ইনসাফভিত্তিক উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন”—এই বার্তাই ভোটারদের কাছে তাদের মূল শক্তি।
অন্যান্য প্রার্থীদের অবস্থান
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, সিপিবি, গণসংহতি আন্দোলনসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা সীমিত পরিসরে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। সম্প্রতি কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী মো. মছিউদদৌলা এবং একতারা প্রতীকের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম চৌধুরী সীতাকুণ্ড প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে নির্বাচনে থাকার বার্তা দেন। তবে মাঠের উত্তাপ এখনো মূলত দুই প্রার্থীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচন একটি বহুমাত্রিক সমীকরণে দাঁড়িয়ে আছে—অভিজ্ঞতা বনাম শৃঙ্খলা, ঐতিহ্য বনাম পরিবর্তন, দৃশ্যমান প্রচার বনাম নীরব ভোট। ৯ জন প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্য খুলবে, তা নির্ধারণ করবে তরুণ ভোটার ও নীরব শক্তির অবস্থান। আর সেই রায় শুধু এই আসনের নয়, জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনাও দিতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক নির্বাচন পূর্ব প্রস্তুতি সম্পর্কে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;