
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের একটি পরিত্যক্ত শিপইয়ার্ডে সাগর থেকে বালু উত্তোলনের জন্য পাইপ স্থাপন করে ডিপ বিগাস লিমিটেড নামের একটি বালু উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান । এই সময় উত্তোলন কৃত বালু রাখার জন্য বড় করে খনন করে ইয়ার্ডের পরিত্যক্ত জায়গায়। খবরটি মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয়দের মাঝে এবং পরবর্তীতে গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে মঙ্গলবার ( ২ ডিসেম্বর ) বিকেলে উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানকে বাধা দেয় এবং স্থানীয়দের বাধার মুখে বালু উত্তোলনের পাইপ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় তারা।
এদিকে গত শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর ) জুমার নামাজের পরে সীতাকুণ্ডে সাগর উপকূলে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত একটি বাল্কহেড ও ড্রেজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। বেশ কিছুদিন ধরে এসব ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে একটি চক্র সাগর থেকে পরিবেশের ক্ষতিকরে অবাধে বালু উত্তোলন করে আসছিল। যা স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ দেখা দেয়। দীর্ঘদিন বালু উত্তোলনের কারণে ইতিমধ্যে সাগরের ওই সব উপকূলের বেড়িবাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে।
শুধু এই দুটি না আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এভাবে সাগর থেকে বালু তুলে যাচ্ছে নিয়মিত। সাগর থেকে অবৈধভাবে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন আটক, জরিমানা করেও বালু উত্তোলন বন্ধ করতে পারছে না ।
কুমিরা নৌ-পুলিশ বিভিন্ন সময় ১৩টি অবৈধ বাল্কহেড জব্দ করেছে। নৌ-পুলিশ জানায়, এসব বাল্কহেডের কোনো সরকারি অনুমোদন বা নিবন্ধন নেই। আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হলেও মালিকরা আবারও তা ফিরে নিয়ে বালু উত্তোলন করছে। প্রতিটি বাল্কহেড ১০-২০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করতে সক্ষম বলে জানা যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায় , বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালু উত্তোলনের জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এই বালু সিন্ডিকেট প্রথমে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও বিআইডব্লিউটিএর কাছে অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হয়। পরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তারা সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলন শুরু করে। আর ইজারা পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত জোন অগ্রাহ্য করে সুবিধামতো স্থান থেকে ইচ্ছেমতো বালু তুলে চলছে। এমনকি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতের খুব কাছে থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গুলিয়াখালী বিচ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ইউএনও মো. ফখরুল ইসলাম জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, এমনিতে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত জনগোষ্ঠী। এভাবে অনুমতি দিলে চার প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য বাল্কহেড নৌপথে অবস্থান করবে, যা জাহাজ ভাঙা শিল্প ও নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী- পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, বালু উত্তোলনের অনুমতি জেলা প্রশাসন দেয়, আমরা দিই না। তবে বালু উত্তোলন এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট দিতে পারি আমরা।
পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে সাগরের তলদেশে পরিবর্তন ঘটতে পারে, উপকূল ভেঙে যেতে পারে এবং মাছের প্রজনন কমে যেতে পারে। পাশাপাশি এ ধরনের কার্যক্রম জাহাজ চলাচলেও ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্দ্বীপ চ্যানেল থেকে উত্তোলিত বালু প্রতি ঘনফুট ৬-৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১২-১৫টি বাল্কহেড ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে প্রতিদিন এবং এভাবে ৫-৭ লাখ টাকার বালু সাগর থেকে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এই উত্তোলিত বালু ভোলা, বরিশাল, খুলনা, হাতিয়া ও নোয়াখালীর চরাঞ্চল এলাকায় পাঠানো হচ্ছে বলে জানা যায় ।
বিআইডব্লিউটিএ সুত্রে জানা যায়, সন্দ্বীপ চ্যানেলে কখনোই বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়নি তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বালু উত্তোলন করছে। স্থানীয়দের মতে এমন অবৈধ কার্যক্রম চলতে থাকলে যেমন পর্যটন স্পট ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি স্থানীয়দের জীবনযাত্রা বিপন্ন হবে তাছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
বালু উত্তোলনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গুলো হলো, ডিপ ডিগার্স লিমিটেড, এম আর ট্রেডার্স, কনষ্টা এইড লিমিটেড, শামা গ্রুপ। তাদের দাবি বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকায় তাদের বালু উত্তোলন বৈধ। অন্যদিকে স্থানীয়রা ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রশাসনের তদারকি না থাকার কারণে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে চলছে।
ভাটিয়ারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল আনোয়ার বলেন, মহাসড়কের এক কিলোমিটার জায়গার মধ্যে যদি সাগর থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করে, তাহলে পরিবেশ ধ্বংস হবেই। স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ক্ষতির শিকার হবেন।
কুমিরা নৌ-পুলিশের ইনচার্জ মো. ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বালু উত্তোলন করা হলেও জব্দকৃত ১৩টি বাল্কহেড়ের কোনো সরকারি নিবন্ধন নেই। আদালতের মাধ্যমে এগুলো জব্দ করা হয়েছে, কিন্তু মালিকরা আবার তা নিয়ে এসে বালু উত্তোলন করছে।
বালু উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ডিপ বিগাস লিমিটেডের কর্মকর্তা সাহিদুল আলম মাসুদ জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি অনুযায়ী বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উপজেলার একাধিক স্থানে বালু উত্তোলন চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন ইঞ্জিনিয়ার মামুন নামে প্রতিষ্ঠানটির অন্য এক কর্মকর্তা।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফখরুল ইসলাম বলেন, সমুদ্র থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। শিপইয়ার্ডে পুরাতন জাহাজ ভাঙা বা কাটিং করার জন্য লিজ দেওয়া হয়। সেখানে বালু মহাল করলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমি শুনেছি বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে বালু উত্তোলন করা হয়। সুতরাং কেউ যদি অনুমতি না নিয়ে বালু উত্তোলন করে সেটা দেখার দায়িত্ব বন্দরের।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;