দেখতে দেখতে পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম দুই দশক বিদায় নিল। আগমন ঘটছে শেষ দশকের। মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত ফজিলতপূর্ণ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শেষ দশকের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ইবাদতের বসন্তকাল মাহে রমজানের শ্রেষ্ঠাংশ হচ্ছে তার শেষ দশক। যারা রমজানের প্রথম দুই দশক কাজে লাগিয়েছেন, তারা বেশ কল্যাণলাভে ধন্য হয়েছেন। আর যারা কাজে লাগাতে পারেননি, তাদের জন্য শেষ দশকে পুষিয়ে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।
মাহে রমজানের শেষ দশকের কোনো এক রাতে লাইলাতুল কদর আছে, যা হাজার রাতের চেয়েও উত্তম। আর সে রাতেই পবিত্র কোরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছে। এ জন্য এই শেষ দশকের আমল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইবাদতে নিমগ্নতার মাধ্যমে এ রাত অন্বেষণ করা চাই। এ সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালোভাবে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। স্ত্রীদের সঙ্গ ত্যাগ করে মসজিদে ইতেকাফে থাকতেন। তাই এই সময়ে আমাদেরও মসজিদে ইতেকাফে সার্বক্ষণিক ইবাদতে কাটানো উচিত। কিন্তু কর্মব্যস্ততার কারণে আমাদের অনেকের পক্ষে ইতেকাফে থাকা সম্ভব নাও হতে পারে। এ সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার পাশাপাশি সালাতুত তারাবি ও সালাতুত তাহাজ্জুদ যথাসাধ্য আদায়ের চেষ্টা করব। কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত, জিকির-আজকারে ব্যস্ত থাকব।
রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারের সবাইকেও জাগিয়ে দিতেন। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন- “রমজান মাসের শেষ দশক শুরু হলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোমর শক্ত করে বাঁধতেন। এই সময়ের রাতগুলোতে জাগ্রত থাকতেন এবং তাঁর গৃহবাসী লোকদেরকে সজাগ করতেন।” (বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস হতে জানা যায় যে, রমজান মাসের শেষ দশক এলেই আল্লাহর রাসুলুল্লাহ (সা.) চূড়ান্ত মাত্রার ইবাদতের জন্য কোমর বাঁধতেন অর্থাৎ পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। আর তিনি একাই ইবাদত-বন্দেগি করতেন এমনটি নয়, বরং নিজের গৃহবাসী আপনজনদেরকেও রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করার জন্য প্রস্তুত করতেন।
জামে তিরমিজিতে উদ্ধৃত হাদিসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের শেষ দশকে তাঁর ঘরের লোকদেরকে ইবাদত-বন্দেগি ও নামাজ আদায়ের জন্য জাগিয়ে দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর অপর একটি বর্ণনায় আরও বলিষ্ঠ ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে তাঁর ঘরের লোকদের মধ্যে রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারে এমন কাউকেই ঘুমাতে দিতেন না। বরং প্রত্যেককেই জাগ্রত থেকে ইবাদত করার জন্য প্রস্তুত করতেন। (উমদাতুল কারি, শরহে বুখারি)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও তাঁর ঘরের লোকদেরকে রমজানের শেষ দশকের সব কয়টি রাত্রিই আল্লাহপাকের ইবাদতে মশগুল হতেন ও মশগুল রাখতেন। এই রাত্রিটির বরকত ও ফজিলত যেন কোনো প্রকারে হারিয়ে না যায় এবং এটা হতে যেন বঞ্চিত থাকতে না হয়, এই উদ্দেশ্যেই তাঁর এই ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্যই বাঞ্ছনীয়। এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোনোই সুযোগ নেই। তাই তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণে সাহাবায়ে কিরাম ও বুজুর্গানে দ্বীন এ দশকে ইবাদতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ যত্নবান থাকতেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, শেষ দশকে আমাদের অনেকেরই একটা বড় সময় কাটে শপিংমলে ঈদের কেনাকাটায়। অথচ চাইলে এই কাজগুলো আগেই সেরে রাখা যেত। রমজানের শেষ দশ দিনে সালাতুত তাহাজ্জুদ, কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত ও জিকির-আজকারসহ অন্যান্য আমলের মাধ্যমে কাটানো চাই। এ ছাড়া রমজানের শেষ দশ দিন ধনীদের জন্য দান-সদকা, অসহায়-দরিদ্রদের সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতামূলক কাজে অংশ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে ইবাদতের মাধ্যমে রমজানের বাকি সময়টুকু কাটানোর তাওফিক দান করুন।
লেখক : আলেম, প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক
খালেদ / পোস্টকার্ড ;