বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক । আট বছর আগে চার লেনে রূপান্তর হওয়া সড়কটিতে ধারণ ক্ষমতার বেশি যানবাহন চলাচল করছে। যে কারণে সড়কটির প্রশস্থতা বাড়ানোর সময় হয়েছে। গত বছর থেকে সড়কটি সম্প্রসারণে সম্ভাব্যতা যাচাই (সমীক্ষা) শুরু হয়। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সমীক্ষা কাজ পুরোপুরি শেষ হলেই প্রকল্প প্রস্তুত হবে। ইতোমধ্যে মহাসড়কটি কত লেনের হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন থেকে বাড়িয়ে ১০ লেনের সড়কে উন্নীত করা হবে। অর্থায়ন নিয়েও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। নির্মাণ-পরবর্তী ১৫ বছর যেন এই মহাসড়কে আর কোন কাজ করতে না হয়, সে লক্ষ্যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সওজ ।
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহেদ হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নিয়ে চলমান সমীক্ষা শেষ হবে সেপ্টেম্বরে। এরপর ডিজাইন এবং অর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। অর্থায়নের বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি আছে। বেশ কয়েকটি বাইরের প্রতিষ্ঠান কাজ করতে আগ্রহী। মূল সড়কটি হবে ছয় লেনের। দুই পাশে দুই লেন করে চার লেনের সার্ভিস লেন হবে। মোট ১০ লেন সড়কের মধ্যে চার লেন থাকবে ডেডিকেটেড। এই চার লেনে সরাসরি ঢাকা থেকে ওঠে সরাসরি চট্টগ্রামে নামবে। কোথাও গাড়ি দাঁড়াবে না। এ চার লেনের দুই পাশে ব্যারিয়ার দেয়া থাকবে। এই চার লেন ব্যবহার করবে মূল ট্রাফিক।
মাঠপর্যায়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সমীক্ষাটি পরিচালনা করছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমইসির নেতৃত্বে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি মহাসড়ক সম্প্রসারণে বিস্তারিত নকশাও তৈরি করবে। এ কাজে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। যাত্রাবাড়ি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ২৩২ কিলোমিটার সড়ক ঘিরেই এই সমীক্ষা কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। ছয়টি জেলা এই মহাসড়কের সাথে সম্পৃক্ত হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘিরে এই প্রকল্পটি হলেও তিনটি ভাগে প্রকল্পটি বিভক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে কোন জায়গা থেকে কোন জায়গা কোন প্রকল্পে অর্ন্তভূক্ত করা হবে তার রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। কত টাকা বরাদ্দ চাওয়া হবে তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। পুরোপুরি সমীক্ষা শেষেই নিশ্চিত করা যাবে। তবে সমীক্ষার শুরুতে ৭৩ হাজার কোটি টাকার মতো লাগতে পারে এমন ধারণা ছিল। প্রকল্প অনুমোদনের আগে সেটি আরও বাড়তে পারে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো সড়কটি নির্মাণে আগ্রহী হওয়ায় প্রকল্পটির ভালো অগ্রগতি হয়েছে ।
সওজ জানায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রাম এই ছয় জেলা মহাসড়কটির সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। মহাসড়কটি প্রায় ২৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ হওয়ায় তিনটি ভাগেই সড়ক উন্নয়ন করা হবে। ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের ৩৮ কিলোমিটার, কুমিল্লা ও ফেনীর ১২৫ কিলোমিটার, ফেনী থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ৬৯ কিলোমিটার সড়ক ১০ লেন হবে। এরমধ্যে যেসব এলাকায় যানজট তৈরি হতে পারে সেখানে ওভারপাস করা হবে। সড়কটি বাঁকা অংশও সোজা করা হবে। ২০১৭ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চার লেনে উন্নীত করা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য মতে, এ সড়কে দৈনিক ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। যা দিনদিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সড়কটি চার লেন হলেও এখনো প্রতিদিন ঢাকার প্রবেশমুখে, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুন্ড এলাকায় নিয়মিত যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। যাত্রীবাহী বাস চলাচলে পথেই বড় ধরনের সময় ব্যয় হয় যাত্রীদের। যে কারণে সড়কটি সম্প্রসারণে জোরালো দাবি তুলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা।
গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত নকশার ওপর মতবিনিময়’ শীর্ষক এক সভা চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় উপস্থিত থাকা তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরীব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পরামর্শ শুনে সড়কটি সম্প্রসারণ অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেন। সেসময় তিনি সড়কটি সম্প্রসারণ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন। বর্তমানে মহাসড়কের পাশে থাকা বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সাথেও মতবিনিময় করেছে সওজ কর্মকর্তারা। এসব সভায় সড়কটি সম্প্রসারিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবাররা কিভাবে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;