
সাম্প্রতিক সময়ে সবজি চাষে গুণতে হওয়া বড় অঙ্কের লোকসানের ধাক্কা সামলে ‘রং বিলাস’ জাতের সোনালি আখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কৃষকরা। উপকূলীয় এ অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া ও অসময়ের বৃষ্টিতে সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের কাছে এখন আখ চাষ এক নতুন আশা ও বিকল্প আয়ের বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে বিপুল পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগের বিপরীতে খেতের রোগবালাই মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সেবা না পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী চাষিরা।
উপজেলা কৃষি দপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সীতাকুণ্ডের ৯ হেক্টর জমিতে মোট ৮১ জন কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আখের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ৫ হেক্টরে স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুস্বাদু জাত ‘রং বিলাস’, ৩ হেক্টরে অন্যান্য স্থানীয় জাত এবং ১ হেক্টরে ২০৮ জাতের আখ চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতি হেক্টরে সম্ভাব্য ফলন ৪৮ মেট্রিক টন ধরে উপজেলায় চলতি মৌসুমে মোট ৪৩২ মেট্রিক টন আখ উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
সরেজমিনে সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের ঢালিপাড়া, ফকিরহাট ও সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক-সংলগ্ন এলাকা ছাড়াও বাঁশবাড়িয়া ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠে বাতাসে দোল খাচ্ছে সোনালি রঙের আখ। ফকিরহাটের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শাহজাহান জানান, কিছুদিন আগে সবজি চাষে ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে মাত্র ১০ হাজার টাকা তুলতে পেরে চরম লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে লোকসান পুষিয়ে নিতে তিনি ইকোপার্ক-সংলগ্ন এলাকায় ২৪ শতক জমিতে আখের চাষ শুরু করেন। চারা রোপণ, জমি প্রস্তুত, সার ও পরিচর্যায় এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হলেও খেতের অবস্থা দেখে এবার তিনি ৫ লাখ টাকার আখ বিক্রির আশা করছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে অন্তত ২ লাখ টাকা নিট লাভের প্রত্যাশা তাঁর। একই এলাকার অপর কৃষক আবদুল্লাহ জানান, নিজের ২২ শতক জমিতে আখ চাষের পাশাপাশি তিনি অন্য কৃষকদের ৫০ থেকে ৬০ শতক জমির আখ কিনে ব্যবসা করছেন, যেখানে প্রায় ৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ১০ লাখ টাকা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন তিনি।
আশার আলো জ্বললেও পাশাপাশি রোগবালাই নিয়ে তীব্র শঙ্কা পিছু ছাড়ছে না চাষিদের। আখের খেতে লাল পচা রোগ (Red Rot) ও গোড়া পচা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে প্রতিকার, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা কিংবা সময়মতো ছত্রাকনাশক (ফাঙ্গিসাইড) স্প্রে করার বিষয়ে কোনো উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার (এসএএও) দেখা মেলে না বলে অভিযোগ কৃষকদের। বিশেষ করে ইকোপার্ক-সংলগ্ন এলাকার খেতগুলোতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেশি দেখা দেওয়ায় দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন ও জরুরি পরামর্শ দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাঠপর্যায়ে সেবার এই ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কল্পনা রহমান জানান, জনবল সংকটের কারণে তাদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উপজেলায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ২৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৯ জন, যার মধ্যে ৪ জন গুরুতর অসুস্থ। ফলে মাত্র ১৫ জন কর্মকর্তা দিয়ে পুরো উপজেলার বিশাল এলাকায় মাঠপর্যায়ে নিয়মিত সেবা পৌঁছে দিতে তাঁদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে বাঁশবাড়িয়া এলাকায় তিনি নিজে সরেজমিনে গিয়ে কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ দিয়েছেন এবং শিগগিরই ইকোপার্ক-সংলগ্ন এলাকাতেও টিম পাঠিয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
কৃষি কর্মকর্তা আরও স্পষ্ট করেন, আখ চাষের জন্য সরাসরি বিনামূল্যে কোনো সরকারি সার বা কীটনাশক সরবরাহের সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকে না। তবে কৃষকদের আর্থিক লাভ বাড়াতে আখের সারির মাঝের ফাঁকা জায়গায় ‘ইন্টারক্রপ’ বা সাথি ফসল হিসেবে আলু, ডালজাতীয় ফসল ও বিলাতি ধনেপাতা চাষের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়লে সীতাকুণ্ডের সোনালি আখ স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com