
সম্প্রতি কিছু দায়িত্বশীল জায়গা থেকে দাবি করা হচ্ছে— “মিলাদে প্রিয়নবী ﷺ-এর প্রতি সালাম পেশ করার পর পীর-মাশায়েখদের নাম যুক্ত করা বেয়াদবি।”
কথাটি ওপর থেকে শুনতে খুবই ইমোশনাল ও আকর্ষণীয় মনে হলেও, ইসলামিক শরীয়তের গভীর নীতি ও দুরুদ-সালামের মৌলিকত্বের বিচারে এটি একটি অন্তঃসারশূন্য ভ্রান্ত উপস্থাপন। খারেজীরা যেমন হজরত আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে কোরআনের আয়াত ‘ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ’ ব্যবহার করেছিল, যার জবাবে আলী (রা.) বলেছিলেন— "কথা সুন্দর, কিন্তু উদ্দেশ্য খারাপ"; বর্তমান এই আপত্তির অবস্থানও ঠিক তেমনই।
অনেকে মনে করেন দুরুদ ও সালাম শুধুই এককভাবে নবীজি ﷺ-এর জন্য নির্ধারিত। অথচ শরীয়তের মূল বিধান হলো:
আল ও আসহাবের সংযোজন: রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে আমাদের যে দরুদে ইব্রাহিমি শিখিয়েছেন, সেখানে তাঁর পবিত্র বংশধর (আলে মুহাম্মদ) ও সাহাবায়ে কেরামকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইমাম কাজী আয়াজ (রহ.) ও মুহিব্বুদ্দীন তাবারী (রহ.)-এর মতে, আলে মুহাম্মদকে যুক্ত না করলে দরুদই অপূর্ণাঙ্গ থাকে।
‘আল’ (آل)-এর ব্যাপকতা: মুহাদ্দিসীন ও মুফাসসিরীনদের তাফসির অনুযায়ী ‘আল’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো— ‘কিয়ামত পর্যন্ত আসা সকল মুত্তাকী মুমিন’। সে হিসেবে গাউস, কুতুব, আবদাল এবং বুজুর্গানে দ্বীন স্বাভাবিকভাবেই দরুদ ও সালামের অন্তর্ভুক্ত হন।
নামাজের তাশাহহুদে সালাম: সালাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর সালাম পেশ করার পরপরই বলা হয়— ‘আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন’ (আমাদের ওপর এবং আল্লাহর সমস্ত নেককার বান্দাদের ওপর সালাম)। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, এই সালাম আসমান ও জমিনের সকল সালেহ (নেককার) বান্দা ও ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে যায়।
সুতরাং, প্রিয়নবী ﷺ-এর প্রতি সালামের পর অনুগামিতা বা ‘তাবআন’ (تبعا) হিসেবে সাহাবা, আহলে বাইত ও অলি-আউলিয়াদের সালাম পেশ করা সুন্নাহ ও শরীয়তের বিধিবদ্ধ নিয়মেরই অনুকূল।
ইমাম আহলে সুন্নাত আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান (রহ.) রচিত বিশ্ববিখ্যাত কাসিদা ‘মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’ (মনজুমায়ে সালামিয়া)-এ বিশ্বনবী ﷺ-এর শানে লাখো সালাম পেশ করার পর পর্যায়ক্রমে আহলে বাইত, সাহাবায়ে কেরাম, গাউসে পাক শেখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এবং অন্যান্য বুজুর্গদের প্রতি সালাম আরজ করা হয়েছে।
কাসিদা ও মিলাদের গ্রহণযোগ্যতা: কেউ কেউ বলেন, আলা হযরত এটি মিলাদের কিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট করে লেখেননি। কিন্তু প্রশ্ন হলো— বিশ্বজুড়ে পঠিত ‘ইয়া নবী সালামু আলাইকা’ কাসিদাও কি কোনো একক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল? কোটি কোটি সুন্নি মুসলমান যুগ যুগ ধরে এগুলো মিলাদের অংশ হিসেবে পড়ে আসছেন এবং এগুলো সুন্নি সমাজে ‘মকবুল-এ-আম’ বা সর্বজনগ্রাহ্য রূপ পেয়েছে।
বিশ্বজুড়ে মিলাদের বৈচিত্র্য: একেক দেশে মিলাদের আঙ্গিকেও কিছুটা বৈচিত্র্য থাকে। পাক-ভারত উপমহাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ বহু দেশে ‘মোস্তফা জানে রহমত’ পড়া হয়। এমনকি বাংলাদেশেও বিভিন্ন দরবারে জিকির বা সালামের আঙ্গি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। কোনো একটি বিশেষ কাসিদা বা পদ্ধতি না পড়লে কাউকে যেমন বাধ্য করা যায় না, তেমনি গ্রহণযোগ্য কাসিদাকে মনগড়া যুক্তিতে ‘নাজায়েজ’ বা ‘বেয়াদবি’ বলা ফিতনা সৃষ্টির শামিল।
আপত্তিকারীদের যুক্তি হলো— অন্য যেকোনো স্থানে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে পীর-আউলিয়াদের নাম নেওয়া যাবে, কিন্তু মিলাদের কিয়ামে নিলে বেয়াদবি হবে। এটি একটি সম্পূর্ণ হাস্যকর ও স্ববিরোধী যুক্তি।
মাহফিলে মহান আল্লাহর নামে ‘নারায়ে তাকবীর’ দেওয়ার ঠিক পরপরই যদি কোনো আলেম বা পীরের নামে স্লোগান দেওয়া আদব বা ইবাদত হতে পারে, তবে প্রিয়নবী ﷺ-এর সম্মানে গঠিত মিলাদে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সালাম দেওয়ার পর তাঁরই অনুগত অলি-আউলিয়াদের সালাম দিলে তা ‘বেয়াদবি’ হয় কীভাবে?
মূলত সমস্যা সালামের বিধানে নয়; সমস্যা হলো এই কাসিদাটি আলা হযরত (রহ.) লিখেছেন এবং এটি কাদেরিয়া-সিরিকোটী সিলসিলাসহ ভারত উপমহাদেশের বহু সুন্নি দরবারে অত্যন্ত ভক্তির সাথে পড়া হয়। অন্ধ মাসলাকী হিংসা ও বিদ্বেষের কারণেই এমন অযৌক্তিক ফতোয়া সৃষ্টি হচ্ছে।
পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও সুন্নিয়াত রক্ষায় অলি-আউলিয়াদের অবদান অনস্বীকার্য:
গাউসে পাক ও খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.): তাঁদের বেলায়েত সার্বজনীন (বেলায়েতে আম্মাহ)। সকল সিলসিলার অনুসারীরাই তাঁদের ফয়েজ ও বরকতের মুখাপেক্ষী।
আওলাদে রাসুল আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটী (রহ.) ও আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.): বাংলাদেশে ‘জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা’ ও ‘কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসা’র মতো দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাজুড়ে সুন্নিয়াতের ভিত্তি মজবুত করেছেন। তাঁদের এই এহসান বা অবদানের কারণে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সালাম পেশ করা সুন্নি মুসলমানদের একটি নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব।
আসলে কোনো ভণ্ড পীরকে মিলাদের সালামে টেনে আনা যেমন অনুচিত, তেমনি হক্কানী অলি-আউলিয়া ও আলেমদের প্রতি ‘তাবআন’ (অনুসরণসূচক) সালাম দেওয়াকে বেয়াদবি বলা চরম অজ্ঞতা।
যদি কোনো মাহফিলে বিশেষ কোনো সিলসিলার মাশায়েখদের প্রতি সালাম দেওয়া হয়, তবে অন্য সিলসিলার অনুসারীদের তা নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার বা হিংসা ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। একজন প্রকৃত দাঈ বা আলেমের দায়িত্ব হলো— সমাজে সহনশীলতা বজায় রাখা এবং সর্বস্তরের সুন্নি আলেম ও অলি-আউলিয়াদের প্রতি পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন করা। মনগড়া যুক্তি দিয়ে শত বছরের প্রতিষ্ঠিত সুন্নী সংস্কৃতি ও আউলিয়াদের শানকে খর্ব করার মানসিকতা পরিহার করাই ঈমানের দাবি।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com