
প্রায় একশ বছর আগে যে পাহাড়, ঝরনা ও অরণ্যের রূপলাবণ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ডের সেই ঐতিহাসিক চন্দ্রনাথ পাহাড় আজও কবির পদচারণার স্মৃতি ধারণ করে আছে।
১৯২৬ সালে কবি চট্টগ্রাম সফরের সময় সীতাকুণ্ডে এসেছিলেন এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও স্মৃতিচারণমূলক লেখায় উল্লেখ রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সেখানে কবির স্মৃতির দৃশ্যমান কোনো সংরক্ষণ গড়ে ওঠেনি। অবশেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২৫টি স্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণের ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কবি নজরুল ইনস্টিটিউট।
কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী জানান, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা নজরুলের বহু স্মৃতিচিহ্ন থেকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ২৫টি স্থান সংরক্ষণের জন্য সরকারের নিকট একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই প্রকল্পের অনুমোদন মিললে চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে পর্যায়ক্রমে সংরক্ষণকাজ শুরু হবে।
তবে কবির সীতাকুণ্ড সফরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস উন্মোচনে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চন্দ্রনাথের ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট স্থানে কবি অবস্থান করেছিলেন কিংবা কোন পথ ধরে তিনি পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন, সে বিষয়ে এখনো প্রামাণ্য সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া নজরুলের সেই সফরে জোঁকের ভয়ে কবির অস্বস্তিতে পড়ার মতো একটি লোকমুখের স্মৃতিচারণও প্রচলিত রয়েছে, যার প্রামাণ্যতা যাচাই জরুরি। তাই সমকালীন সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, পুরোনো আলোকচিত্র ও দুর্লভ নথিপত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য গবেষণার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নজরুলের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে চন্দ্রনাথের পাহাড়ি প্রকৃতির রয়েছে এক আত্মিক যোগসূত্র। সাহিত্যপ্রেমীদের ধারণা, কবির বিখ্যাত গান ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’-এর মূল চিত্রকল্পের সঙ্গে সীতাকুণ্ডের এই পাহাড়ি প্রকৃতির গভীর মিল রয়েছে। কেবল একটি স্মারকফলক স্থাপনই নয়, বরং সেখানে একটি ‘নজরুল স্মৃতি কর্নার’ বা তথ্যকেন্দ্র এবং ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার প্রস্তাব এসেছে। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডের স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চলগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে একটি ‘নজরুল স্মৃতি পথ’ গড়ে তোলারও উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
নজরুল স্মৃতির পাশাপাশি চন্দ্রনাথের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশ ও সাহিত্যসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, পাহাড় কেটে কোনো কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না; বরং চারপাশের বন, ঝরনা ও পাহাড়কে সম্পূর্ণ অক্ষত রেখেই কবির স্মৃতিকে দৃশ্যমান করতে হবে। যে প্রকৃতি ও অরণ্য পরম যত্নে কবির স্মৃতিকে বুকে আগলে রেখেছে, সেই প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেওয়াই হবে মূলত কবির স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
নজরুল ইনস্টিটিউটের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চন্দ্রনাথ পাহাড় কেবল সাধারণ একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য জীবন্ত তীর্থভূমি ও স্মৃতিভূমিতে রূপান্তরিত হবে।
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com