
সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু যেন এখন মরণঘাতী রূপ নিয়েছে। অসচেতনতা আর মশার প্রজনন রোধে কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে একের পর এক তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। সর্বশেষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। অথচ টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। একই পরিবারের ৯ জন সদস্য বর্তমানে জ্বরে ভুগে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়লেও স্বাস্থ্য বিভাগের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার ইমাম হোসেন ও সুমি আক্তার দম্পতির একমাত্র মেয়ে ছিল লামিয়া। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে নেওয়ার পথে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় সে। খালের পাড়ে টিনশেডের কাঁচা ঘরটির ছোট্ট উঠানে গাছের সঙ্গে বাঁধা দড়িতে ঝুলছে ছোট্ট লামিয়ার কয়েকটি পোশাক। ঘরে চলছে মা সুমি আক্তারের বুকফাটা বিলাপ—‘আমার বুকটা খালি করে চলে গেলি। আমি কাকে নিয়ে থাকব?’ বারান্দায় নির্বাক ও পাথর হয়ে বসে আছেন বাবা ইমাম হোসেন। মেয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, প্রতি শুক্রবার বাবার সঙ্গে মসজিদে যেত ছোট্ট লামিয়া। খুব সুন্দর গজল গাইত সে। অথচ কে জানত, এই চলে যাওয়াটাই হবে তার চিরদিনের বিদায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাবা ইমাম হোসেন নিজে কয়েক দিন জ্বরে ভুগে সুস্থ হওয়ার এক দিন পর গত সোমবার সর্দি-কাশিসহ জ্বরে আক্রান্ত হয় শিশু লামিয়া। গত বুধবার থেকে সে কিছু খাচ্ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে পরপর দুবার কালো রঙের বমি হওয়ার পর বিআইটিআইডি হাসপাতালে নেওয়ার পথে ভাটিয়ারীতে পৌঁছতেই তার খিঁচুনি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের গেটে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে যায়।
লামিয়াদের ওই বাড়ির এক সারিতে থাকা চারটি ঘরে অন্তত নয়জন বাসিন্দা বর্তমানে জ্বরে আক্রান্ত। এর মধ্যে লামিয়ার দাদি এবং দুই চাচাও রয়েছেন। তিন থেকে পাঁচ দিন ধরে জ্বর থাকলেও বেশিরভাগের ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে, প্রতিটি ঘরের সামনে বৃষ্টির পানি জমানোর বালতি ও ড্রাম উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যা মশার লার্ভায় ভর্তি। কবুতরকে পানি দেওয়ার নাম করে জমে থাকা এই পানিগুলোই এডিস মশার বংশবিস্তারের কারখানা হিসেবে কাজ করছে, যা স্থানীয়দের চরম উদাসীনতার প্রমাণ দেয়।
১৫ দিনে ৫ জনের প্রাণহানি
সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত ১৫ দিনে সীতাকুণ্ডে তিন শিশুসহ মোট পাঁচজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর সোনাইছড়ির ফুলতলায় চার বছরের মোজাহিদুল ইসলাম, ১৫ সেপ্টেম্বর ভাটিয়ারীর রাফসান (২৪), ১৭ সেপ্টেম্বর পৌরসভার সিরাজুম মুনিরা (৫) এবং গত মঙ্গলবার কাজলীপাড়ার কোরবান আলী রিফাত (১৭) ডেঙ্গুতে মারা যান। একের পর এক এমন মৃত্যু হলেও মশার ওষুধ ছিটানো কিংবা সচেতনতামূলক কার্যক্রমে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি সময়মতো মশা নিধন ও সচেতনতামূলক অভিযান চালানো হতো, তবে হয়তো লামিয়াদের মতো এভাবে আর কোনো শিশুকে হারাতে হতো না। অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার দায় এড়াতে পারে না স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। অবিলম্বে ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মশার লার্ভা ধ্বংস এবং প্রতিটি ঘরে ঘরে চিকিৎসাসেবা ও সচেতনতা পৌঁছানোর জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com