
ইসলামে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। মানুষ যত বড় পাপই করুক না কেন, জীবিত থাকা অবস্থায় আন্তরিকভাবে তওবা করে ফিরে এলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তবে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু নির্দিষ্ট সময় ও পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন তওবা বা ঈমান গ্রহণ আর গ্রহণযোগ্য হয় না। তাই সময় থাকতে পাপ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রত্যেক মুমিনের জন্য জরুরি।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে তওবা কবুল না হওয়ার প্রধান পরিস্থিতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
মানুষের মৃত্যু যখন একেবারে আসন্ন হয়ে পড়ে এবং প্রাণ কণ্ঠনালিতে পৌঁছানোর উপক্রম হয়, তখন তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, তখন অদৃশ্য জগতের বাস্তব চিত্র মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ ইসলামে তওবা করতে হয় অদেখা জগতের ওপর বিশ্বাস রেখে এবং সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তাদের জন্য কোনো তওবা নেই, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তওবা করছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৮)
এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয় বা প্রাণবায়ু কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৩৭) এর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো ফেরাউন। লোহিত সাগরে ডুবে যাওয়ার সময় মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে সে ঈমান আনার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু অন্তিম মুহূর্তের সেই বিশ্বাস ও তওবা আল্লাহ গ্রহণ করেননি।
কিয়ামতের অন্যতম বড় ও চূড়ান্ত নিদর্শন হলো পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবার সুযোগ খোলা থাকে। কিন্তু পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্য ঈমান আনা ও তওবার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যেদিন তোমার রবের কোনো নিদর্শন এসে পড়বে, সেদিন কোনো ব্যক্তির ইমান তার কাজে আসবে না, যদি সে আগে ইমান না এনে থাকে অথবা তার ইমানের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ অর্জন না করে থাকে।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৫৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৭০৩)
ইসলামে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক বা মানুষের অধিকার—দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ, রোজা বা ইবাদতসংক্রান্ত আল্লাহর হক লঙ্ঘিত হলে আল্লাহ চাইলে নিজ অনুগ্রহে তা ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু কোনো মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ, সম্মানহানি বা অন্য কোনো উপায়ে কারও অধিকার নষ্ট করা হলে, শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই তা মাফ হয় না।
এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক। মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে বা কোনো জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে তা মাফ করিয়ে নেয়...।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯) বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম নববি (রহ.) তাঁর ‘রিয়াদুস সালিহিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বান্দার হক নষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রাপককে তার অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া তওবা কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক হলো সবচেয়ে বড় ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তবে দুনিয়াতে জীবিত থাকা অবস্থায় কেউ যদি শিরক বা কুফরি থেকে আন্তরিকভাবে তওবা করে খাঁটি মনে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু কেউ যদি শিরক বা কুফরের ওপর অটল ও অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তবে আখিরাতে তার জন্য ক্ষমার কোনো সুযোগ থাকবে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪৮) তাই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শিরক থেকে দূরে থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর অবিচল থাকা অপরিহার্য।
তওবা কেবল মুখে কিছু শব্দের আনুষ্ঠানিক উচ্চারণ নয়। প্রকৃত তওবার জন্য অতীতের পাপে লজ্জিত হওয়া, তাৎক্ষণিকভাবে সেই পাপ কাজ পরিহার করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প করা জরুরি। শয়তানের প্ররোচনায় বা দীর্ঘায়ুর আশায় তওবা পিছিয়ে না দিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, অনিশ্চিত এই জীবনে কখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে তা কেউ জানে না।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com