শুক্রবার একমাত্র মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িভর্তি আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে আয়োজন করা হয়েছিল আনন্দঘন এক উৎসব। সেই উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র তিন দিনের মাথায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ২১ বছর বয়সী মাইশা মুশফিরাত। গত মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লরির ধাক্কায় মিনিবাস উল্টে চাপা পড়ে এই করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবীর দায়িত্ব পালন করতে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিলেন মাইশা। রাস্তা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ক্যাম্পাসের সামনের মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় দুটি লরি পাল্লা দিয়ে ছুটে চলার একপর্যায়ে হঠাৎ একটি প্রাইভেটকার গতি কমিয়ে বাঁক নিলে একটি লরি সজোরে ধাক্কা দেয় পাশে থেমে থাকা একটি মিনিবাসকে। বাসটি কাত হয়ে উল্টে গিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিন ছাত্রীর ওপর পড়ে, যার নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন মাইশা।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো ক্যাম্পাসে নেমে আসে শোকের ছায়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সহপাঠী ও শিক্ষকদের কান্নায় চমেক হাসপাতাল এবং ক্যাম্পাস চত্বর ভারী হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হাসমত আলীসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ছুটে যান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তান হারানোর মতো গভীর বেদনা প্রকাশ করেন।
মাইশার ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটি ছিল লড়াই ও সংগ্রামের। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি তাঁর বাবা সাফায়াত হোসেনকে হারান। পরবর্তীতে তাঁর মা সালমা আক্তার প্রবাসী দিদারুল আলমকে বিয়ে করলেও সৎ বাবা মাইশাকে নিজের তিন পুত্রসন্তানের মতো স্নেহে ও ভালোবাসায় বড় করে তুলছিলেন। মায়ের বহু কষ্ট ও লড়াইয়ের ফসল ছিল এই একমাত্র মেয়ে। মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে অনেক বড় হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ঘাতক লরি সব শেষ করে দিল।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা সালমা আক্তারের বিলাপ উপস্থিত সবাইকে কাঁদিয়েছে। আহাজারি করতে করতে তিনি বারবার বলছিলেন, গত শুক্রবারই আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত খাইয়ে ঘটা করে মেয়ের জন্মদিন পালন করেছিলেন, অথচ সেই আনন্দের স্মৃতিগুলো এখন কেবলই বেদনা হয়ে রইল। মাইশার মুঠোফোনের কভারে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্ট্রে বার্ডস’ গ্রন্থের অমর বাণী—‘জীবন হোক গ্রীষ্মের ফুলের মতো সুন্দর, আর মৃত্যু হোক শরতের ঝরা পাতার মতো স্নিগ্ধ’ খোদাই করা ছিল। কে জানত, সেই স্নিগ্ধতার উপমা এত দ্রুত ও নির্মমভাবে তাঁর জীবনে নেমে আসবে?
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রথম জানাজা শেষে মাইশার মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে বাদ এশা দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরহুম বাবা সাফায়াতের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই তরুণীকে। সড়ক দুর্ঘটনায় এক মেধাবী ছাত্রীর এমন আকস্মিক প্রয়াণে পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com