
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর থেকেই চট্টগ্রামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থা। গত এক মাসেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দক্ষিণাঞ্চলের অধীন এলাকাগুলোতে একশরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি সই করেছেন। ছাদেই উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডে তা সরবরাহ করে অনেকে এখন আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে গত ১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগ একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেয়। এই প্যাকেজের নিয়ম অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসকল গ্রাহক ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, সরকার তাদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সাড়ে ১০ টাকা দরে কিনে নেবে। উদ্যোক্তারা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রির সুবিধা পাবেন। সরকারের কাছে এই বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে খুব সহজেই সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রাথমিক খরচ তুলে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে নেট মিটারিংয়ের ধারণা নতুন না হলেও এবং পূর্বে বড় কিছু প্রতিষ্ঠানে এটি চালু থাকলেও বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণার পর এর পরিধি ও জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বড় বড় শিল্প-কারখানা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনগুলোর মালিকরা নিজেদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করছেন। দেশের চলমান তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরসংলগ্ন ফৌজদারহাট শিল্প এলাকায় নেট মিটারিংয়ের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। এই এলাকার বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের অধীন পাঁচটি বড় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে পিএইচপি শিপইয়ার্ড, প্যাসিফিক রিসাইকেল, বিএম কনটেইনার ডিপো, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এবং কেডিএস লজিস্টিকস।
ফৌজদারহাট বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন এই ব্যবস্থার সুফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, সোলার প্যানেল থেকে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাসিক বিদ্যুৎ বিল অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিড থেকে তাদের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতাও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
বিষয়টি পরিষ্কার করতে একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে এই প্রকৌশলী জানান, ধরা যাক এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মোট দৈনিক চাহিদা ৮০ হাজার ইউনিট, কিন্তু তারা উৎপাদন করছে ১ লাখ ইউনিট। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২০ হাজার ইউনিট তারা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে, যার আর্থিক মূল্য মাসিক বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকরা যেমন কম খরচের সুফল পাচ্ছেন, তেমনি বিদ্যুৎ বিভাগও বাড়তি বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে কোরিয়ান ইপিজেডেও। নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালুর পূর্বে এই প্রতিষ্ঠানের মাসিক বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ ছিল ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার ঘরে। তবে বর্তমান সময়ে নেট মিটারিং চালুর সুবাদে তাদের সেই মাসিক বিল এক কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য।
নেট মিটারিংয়ের এই অগ্রগতির বিষয়ে পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর সোলার প্যানেল স্থাপনে গ্রাহকদের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের ওপর সামগ্রিক চাপ কমছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় এর দারুণ ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে এর সুবাদে দিনে অন্তত ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা কমে এসেছে এবং সামনের দিনগুলোতে এই পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আন্তরিকতার প্রতিফলন বলে মনে করছেন সোলার মডিউল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম বাকি মাসুদ। তিনি মনে করেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, নেট মিটারিং ব্যবস্থা এতটা জনপ্রিয় হওয়ার কারণে সেই লক্ষ্য খুব দ্রুতই অর্জিত হবে এবং এই খাতে বিনিয়োগ ও পেশাদারত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com