চট্টগ্রামের সংস্কৃতিতে ‘মেজবান’ শব্দটি কেবল আতিথেয়তা বা খাওয়াদাওয়া নয়, বরং এটি একটি বিশাল ঐতিহ্যের প্রতীক, যা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘মেজজান’ নামেও পরিচিত। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবাসী বাঙালিদের কাছেও এই ভোজনবিলাসী আয়োজনটি অত্যন্ত প্রিয়। গরুর মাংসের বিশেষ ও সুস্বাদু পদ দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করার এই রীতি চট্টগ্রামের মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার বা সামাজিক অনুষ্ঠানেই ছোট-বড় মেজবানি আয়োজনের চল রয়েছে।
এই আভিজাত্যময় ঐতিহ্যের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে চট্টগ্রামের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে তাকাতে হয়। সমুদ্রতীরবর্তী হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের পর্যটক, বণিক ও পণ্ডিতদের কাছে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। বিভিন্ন সুলতান ও রাজাদের আমলের মুদ্রা এবং ভ্রমণকারীদের লিখিত বিবরণ ও মানচিত্রে চট্টগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এই বন্দর নগরীকে ‘সোদকাওয়াও’ (চট্টগ্রাম) নামে অভিহিত করে একে বিশাল সমুদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বড় শহর বলে বর্ণনা করেছেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদেশি ভ্রমণকারীরা বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামকে ভিন্ন ভিন্ন নামে উল্লেখ করেছেন। ইবনে বতুতা যেখানে এটিকে ‘সোদকাওয়াও’ বলেছেন, সেখানে প্রায় ১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চীনা পর্যটক ফেই-শিন তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে চট্টগ্রামকে ‘চা-টি-কিয়াং’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর লেখায় তৎকালীন সমৃদ্ধ চট্টগ্রামের চিত্র উঠে আসে। তিনি উল্লেখ করেন, যখন রাজকীয় জাহাজ এখানে পৌঁছাত, তখন স্থানীয় শাসক পতাকা ও উপহারসহ রাজকর্মচারীদের স্বাগত জানাতে পাঠাতেন এবং হাজার হাজার ঘোড়া ও মানুষ বন্দরে এসে উপস্থিত হতো। এটি তৎকালীন চট্টগ্রামবাসীর আপ্যায়নপ্রিয়তা ও আভিজাত্যেরই প্রতীক।
সময়ের পরিক্রমায় চট্টগ্রাম তার নিজস্ব জীবনধারা, ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষির সাথে খাদ্যাভ্যাসের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। প্রাচীন এই জনপদ নিয়ে অনেক প্রবাদ-প্রবচনও প্রচলিত আছে। ‘যার খোয়ালত নাই / তার মেজবানি বাড়িতও নাই’—চট্টগ্রামের এই আঞ্চলিক প্রবাদটি অতিথিদের প্রতি আতিথেয়তার বিশালতাকে নির্দেশ করে, যেখানে ভাগ বা সামর্থ্য না থাকলে মেজবানিতেও জুটত না। ফার্সি শব্দ ‘মেসবান’ বা ‘মেজবানি’ থেকে আসা এই আতিথেয়তা এবং মেহমানদারি—এই দুটি শব্দই চট্টগ্রামে ‘মেজজান’ হিসেবে প্রচলিত হয়েছে। এটি আদতে কোনো ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং এটি ছিল ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য উদরপূর্তি খাবারের এক মিলন উৎসব।
ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকের দিকে কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের লেখায় চট্টগ্রামের মেজবানি আয়োজনের প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিজুগুপ্তের ‘পদ্মপুরাণ’ কাব্যে तत्कालीन বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি উত্তর চট্টগ্রামের নানুপুর এলাকার শাহ বারিদ খানের রচনায় মেজজান বা মেজবানি শব্দের অস্তিত্ব সুষ্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গের প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুল ইসলাম শাহ বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা করার পর থেকেই বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী শহর হিসেবে এই অঞ্চলটির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। একই সাথে আরব ও ভারতীয় উপমহাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছেও চট্টগ্রাম একটি আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আরব পীর-আওলিয়াদের আগমনেও এই অঞ্চলে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে, যা চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খালেদ / পোস্টকার্ড ;
প্রধান সম্পাদক : খালেদ সরফুদ্দীন, সম্পাদক ও প্রকাশক : এসকে এম মেজবাহ উদ্দীন খালেদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রফিক টাওয়ার ( নীচ তলা ), ফকির হাট, জনতা ব্যাংকের নীচে, দক্ষিণ সলিমপুর, জাফরাবাদ, সীতাকুণ্ড , চট্টগ্রাম- ৪৩১৭।
ফোন : +৮৮০ ১৮২১৪৩১১৪৪, ই-মেইল : skmkhaled@gmail.com
All rights reserved © 2019 Postcardbd.Com