বাংলাদেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাইলফলকে

বাংলাদেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাইলফলকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা।।

বাংলাদেশ এখন শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাইলফলকে পৌঁছানোর অপেক্ষায় । সব কিছু পেছনে ফেলে গত ৫০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। পাহাড়, কিছু দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন অফগ্রিডের ১ শতাংশ এলাকায় আগামী মার্চের মধ্যেই বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হবে। সেই হিসাবে মুজিববর্ষেই দেশের গ্রিড-অফগ্রিড মিলে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় চলে আসবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)-এর দায়িত্ব প্রাপ্তদের দেওয়া তথ্যে, দেশের অফগ্রিড এলাকার ১ হাজার ৫৯টি গ্রামের মধ্যে ২৯টি গ্রাম বাদে ১ হাজার ৩০টি গ্রাম গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত হবে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে। ২৯টি গ্রামকে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে না। কারণ এই গ্রামগুলো বড় এবং সেখানে ১০-২০ কি.মি. এলাকাজুড়ে ৫ থেকে ১০ জন করে মোট ৬ হাজার গ্রাহক আছে। যাদের অনেকে আবার চর এলাকায় বছরের একটি সময়ে পানিতে ভাসেন। এসব গ্রামে ৩০ ওয়াট, ৫০ ওয়াট ও ৭৫ ওয়াট করে সোলার বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে সৌর বিদ্যুতের টেন্ডার কাজ শেষ হয়েছে। দুই-এক মাসের মধ্যে তারাও বিদ্যুৎ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। 

চাহিদার চেয়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট বেশী বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতা এখন বাংলাদেশের।

আগামী মার্চের মধ্যেই শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষে কাজ করছে সরকার।

নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিনের ক্যাবলে মাধ্যমে নেয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ।

বর্তমানে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে লোডশেডিং কমে গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে, ভোলা এবং পটুয়াখালীর দুর্গম ১৬টি চরের কয়েক লাখ মানুষের বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে অফগ্রিড এলাকার এসব চরের মানুষের জন্য সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ পেতে যাচ্ছেন ৩৭ হাজারের বেশি গ্রাহক। এ ছাড়া ফরিদপুরের পদ্মার চর অঞ্চলের মানুষের মাঝে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বিদ্যুৎ পেতে যাচ্ছে এই এলাকার মানুষজন। দুর্গম এই চরের ১০ হাজারের বেশি পরিবার এবার বিদ্যুতের আলোয় নিজের ঘর আলোকিত করার সুযোগ পাবেন। ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের অফগ্রিড এলাকা পদ্মার চরে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু করেছে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় ১৫০ বছর পুরনো দুর্গম চরাঞ্চল। এখানকার কয়েকটি গ্রামে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করেন। ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এসব গ্রাম পদ্মা নদীর কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। বিদ্যুৎ এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। গত ৩ জানুয়ারি এই ২টি ইউনিয়নেও বিদ্যুতের আলো পৌঁছে গিয়েছে। এই চরাঞ্চল এলাকায় ২২১টি সংযোগের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া শুরু হয়েছে। এখানে পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে লাইন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, চাহিদা যদিও ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতা এখন বাংলাদেশের রয়েছে। ২০৪১ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনায় দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন হিসাব করে নতুন নতুন বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। এই সময়ে বিদ্যুৎ খাতে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী বেসরকারি খাত। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের অংশীদারি এখন প্রায় অর্ধেক। বিপুল বিনিয়োগে সক্ষম এই বেসরকারি খাত দক্ষ জনবলে সমৃদ্ধ। কর্মসংস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বেসরকারি খাত। বিদ্যুৎ খাতের এই অগ্রগতি সারা দেশের চিত্রই পাল্টে দিয়েছে।

পাওয়ার সেলের তথ্য মতে, স্বাধীনতার আগে (১৯৭১ সাল) বিদ্যুতকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল দশের কম। বর্তমানে বিদ্যুতকেন্দ্রের সংখ্যা ১৪০। উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩০০ মেগাওয়াট। এখন উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্যসহ)। বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ছিল ৩ শতাংশ, এখন বেড়ে হয়েছে ৯৯ শতাংশ। বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা হয়েছে তিন কোটি ৮৯ লাখ। আগে আমদানি করা বিদ্যুৎ ছিল না, বর্তমানে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা হয়েছে ৪৭ হাজার ৮২৪ এমভিএ। সঞ্চালন লাইন এখন ১২ হাজার ৪৪৪ সার্কিট কিলোমিটার। বিতরণ লাইন এখন বেড়ে হয়েছে পাঁচ লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার। মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টায়। বিতরণ সিস্টেম লস এখন কমে হয়েছে ৮.৭৩ শতাংশ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমরা গ্রিডের বিদ্যুৎ শতভাগ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছি। আশা করছি, অফগ্রিডের বাকি ১ শতাংশ কাজ আগামী মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করে ঘরে ঘরে শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া  অফগ্রিড এলাকা যেমন- দুর্গম পাহাড় ও চরাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। একসময় যেসব চর এলাকায় বিদ্যুৎ পাওয়া মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল তা এবার পূরণ হতে চলেছে।