তবে কি চক্রান্তের শিকার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক?

তবে কি চক্রান্তের শিকার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক?
তবে কি চক্রান্তের শিকার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক?

পোস্টকার্ড ডেস্ক ।।

জেলা প্রশাসকের অপসারণের দাবীতে গত ১২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম আদালত ভবন চত্বরে আইনজীবীরা অবস্থান ধর্মঘট করেছিল । সেদিন তারা বলেছিল, "জেলা প্রশাসকের অপসারণ চায় "। এর আগে জঙ্গল সলিমপুরে অবস্থানরত বিভিন্ন সংগঠনের দাবী ছিল," চট্টগ্রাম থেকে জেলা প্রশাসকের অপসারণ"! তাছাড়া পাহাড় কাটার সাথে জড়িত ভূমি দস্যুরাও জেলা প্রশাসকের অপসারণের দাবী তুলে যাচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল ভূমিহীন কল্যাণ পরিষদ নামে এক সংগঠন ঠিক একই দাবী তুলেছেন । তাছাড়া সম্প্রতি একটি মোনাজাতকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগ যোগ হলো । এই দাবীতে অনেকে আবার জেলা প্রশাসকের অপসারণের দাবী সামনে আনছেন । 

আর এসব সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি জায়গা উদ্ধারে অভিযানের পর থেকেই এ ধরনের অপপ্রচার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তাছাড়া এর মধ্যে জেলা প্রশাসকের একটি মোনাজাতের ভিডিও নিয়েও জল ঘোলা করছে অনেকে । তবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এসব অপপ্রচারকে পূর্ব পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। বিভিন্ন প্রার্থীর অনেক কর্মী, সমর্থক, দলীয় নেতাকর্মীতে পরিপূর্ণ ছিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। সম্মেলন কক্ষে ওইদিন সকাল ১০ টা হতে সম্প্রীতি সমাবেশ, আসন্ন দুর্গাপূজার প্রস্তুতিমূলক বিশেষ সভা, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের চেক বিতরণের কর্মসূচিও ছিল।

ওইদিন সভাস্থলে উপস্থিত থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষের ভিড়ের কারণে সভাকক্ষে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড, মিরসরাইয়ের রেলক্রসিং দুর্ঘটনা ও গত ১৪ সেপ্টেম্বর জোরারগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চারজন ব্যক্তির আত্মার মাগফেরাত কামনা করার কথা ছিল। এরমধ্যে মনোনয়ন দাখিলের ভিড়ের মধ্যে শ্রমিক লীগ নেতা সফর আলী মোনাজাত ধরেন। সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত অনেকেই মোনাজাত অংশ নেন। এরমধ্যে জেলা প্রশাসক সকলকে মোনাজাত পরিচালনায় নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তবে মোনাজাতে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা মোনাজাতে বলা হয়নি।

আরও জানা গেছে, কোনো দলের পক্ষে ভোট চাওয়া বা জেলা পরিষদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো কোনো বক্তব্য জেলা প্রশাসক ওইদিন দেননি। আর জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কোনো দলের কোনো প্রার্থী বা সমর্থক কোনো আপত্তি বা অভিযোগ উত্থাপন করেননি। রোববার (১৮ সেপ্টেম্বর) রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে জেলা পরিষদ নির্বাচনের শত শত প্রার্থী, কর্মী, সমর্থকদের উপস্থিতিতে মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয়। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময়ও কোনো প্রার্থী বা কর্মী-সমর্থক কেউ রিটার্নিং কর্মকর্তার কোনো কর্মকাণ্ডে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে—এরূপ আপত্তি বা কথা বলেননি। এ সংক্রান্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে একটি মোনাজাতকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অপপ্রচার, দুর্নীতিবাজদের উষ্কানি দিয়ে সুশাসন ও চট্টগ্রামের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা তৈরির অপচেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ। 

তারা মনে করেন , সরকারি জায়গা দখল করে ছিন্নমূল অসহায় মানুষদের গুরুতর অপরাধ চক্রের সাথে জড়িয়ে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা সুশাসন এবং মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের মোনাজাতে অংশগ্রহণ করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার করা হয়েছে তা সামাজিক, আচরণগত এবং কাঠামোগতভাবে বিদ্যমান ধর্মীয় বিদ্বেষকে ফুটিয়ে তুলেছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মমিনুর রহমানের সাফল্য আর জনমুখী কাজে অখুশি চক্রটিকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ। দুর্নীতিবাজ চক্রটিই ডিসির ‘ভালো কাজে’ ঈর্ষান্বিত হয়ে অপপ্রচার শুরু করেছে অভিমত তাদের ।

তারা বলেন, সুশাসনের পক্ষে, দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে, ন্যায়বিচারের দাবিতে সাধারণ জনগণ এবং সুশীল সমাজ জেলা প্রশাসকের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তবে আমরা মনে করি, মোনাজাতের ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে অপপ্রচার আবারো প্রমাণ করে যে এটি কোনো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি প্রশাসনের পদ্ধতিগত সংস্কারের সুনির্দিষ্ট বিরোধিতা। ছিন্নমূল মানুষের স্বচ্ছ জীবনযাপনের অধিকার সুরক্ষা ও শক্তিশালীকরণে, পদ্ধতিগত সংস্কারের পক্ষে আমরা আমাদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরছি। দখলবাজদের বিরুদ্ধে সংবেদনশীল বিচার ব্যবস্থার প্রণয়ন ও চট্টগ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়ন, সরকারি ভূমি পুনরুদ্ধারে ইতিপূর্বের প্রশাসনের নিরব ভূমিকার পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা করার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত।

চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ সৎ কর্মকর্তা ও প্রশাসনকে সমর্থন ও সুরক্ষা প্রদান এবং জরুরি সংস্কারের পক্ষে। এছাড়া, একটি গোষ্ঠীর পরিকল্পিত অপপ্রচার, সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের সুরক্ষার, দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষায় পেশাজীবীদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই বলে তারা উল্লেখ করেন।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সময়ে বেশ কিছু কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে নির্বাচন, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান, জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান অন্যতম। তাছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ওপর হামলা ও হত্যার হুমকি হয়েছে । 

জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে নির্বাচন

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান যোগদানের পর থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, ১৬টি পৌরসভার নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কখনো কোনো দল বা প্রার্থী জেলা প্রশাসক চট্টগ্রামের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা বা ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সামান্যতম কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেননি।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নেন মো. মমিনুর রহমান। এরপর থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ১৩৬টি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে ৫টি দুর্নীতির মামলায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ৩৯ কারাদণ্ড, ৯৬ জনকে জরিমানা, সাতজনকে চাকরিচ্যুত, ৯ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধির আওতায় ২টি, দুদক আইনে মামলা করা হয়েছে ৩টি, ১৯৩ জন দুর্নীতিবাজ ওমেদার ও অস্থায়ী কর্মচারীকে ভূমি অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ১০৮টি সরকারি অফিস যথাক্রমে ভূমি অফিস, তহশিল অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে ৭১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান

চট্টগ্রাম জেলার পাহাড় থেকো, ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার মূল্যবান খাসজমি উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ৩১০০ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। জেলা প্রশাসকের এ কর্মকাণ্ডে একটি চক্র নানামুখি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ওপর হামলা ও হত্যার হুমকি

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নাজমুল আহসান, উপ পরিচালক (স্থানীয় সরকার) বদিউল আলম, জেলা প্রশাসনের দুজন কর্মচারী এবং নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত একজন আনসার সদস্যের ওপর হামলা চালিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়েছে। এ সকল ভূমিদস্যু গ্রুপ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং র‍্যাব-৭ কমান্ডিং অফিসারের ওপরও হামলা করেছে। এ সকল প্রভাবশালী, ভূমিদস্যু এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) রেজিস্ট্রি ডাকযোগে হত্যার হুমকিও প্রদান করা হয়েছে। মূলত জঙ্গল সলিমপুরের উচ্ছেদ প্রতিহত করা এবং রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করার জন্য ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট নানামুখি অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান বলেন, এ সকল ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে আমাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলকালীন সময়কার অসত্য সংবাদ কিছু কিছু মিডিয়ায় প্রকাশ করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি লিগ্যাল নোটিশ ইস্যু হওয়ার আগেই বা নোটিশ গ্রহীতারা নোটিশ পাবার পূর্বেই কিছু মিডিয়ায় লিগ্যাল নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয়, বিষয়টি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত একটি অপপ্রচার।

খালেদ / পোস্টকার্ড ;