২০ বছর পর মুক্তি পাচ্ছে এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড

২০ বছর পর মুক্তি পাচ্ছে এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড
২০ বছর পর মুক্তি পাচ্ছে এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড
কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড নুর আলম প্রায় ২০ বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। তার সাজার মেয়াদ শেষ হওয়া ও অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাকে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন আদালত।
 
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় জন্মস্থান কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদার খুলনায় বসবাসরত থাকা কালিন সন্ত্রাসের রামরাজত্ব করে সন্ত্রাসীর গডফাদার হয়ে খুন ধর্ষণসহ বহু অপরাধ জগতের নায়ক এরশাদ শিকদার। নুর আলম সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড ছিলো। এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড নুর আলম ১২ খুনের সহযোগী।
 
সোমবার (২৯ জুলাই) ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ শেখ হাফিজুর রহমান এই আসামিকে মুক্তির আদেশ দেন।
 
জানা যায়, এরশাদ শিকদার গ্রেপ্তার হওয়ার পর নুর আলম রাজসাক্ষী হন। তার সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে খুলনার জলিল টাওয়ার মালিকের ম্যানেজার খালিদ হত্যা মামলায় তার ফাঁসির আদেশ হয়। ২০০৪ সালের ১০ এপ্রিল মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে এরশাদ শিকদারের ফাঁসি কার্যকর হয়। এভাবে একে একে ১১টি মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে কারাগার থেকেই এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন নুর আলম। বাকি ছিল রাজধানীর লালবাগ থানার আজিজ অপহরণপূর্বক হত্যা মামলার সাক্ষ্য দেওয়া। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট মামলাটি চার মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ দেন। সোমবার মামলাটির ধার্য তারিখে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে আইনজীবী মুনতাছির মাহমুদ রহমান কারামুক্তির আবেদন করেন। বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান আবেদন মঞ্জুর করে কারামুক্তির আদেশ দেন। শুনানিকালে নুর আলমকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে নেওয়া হয়। সেখানে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিনিয়র সহকারী জজ মো. আলমগীর হোসাইন তার সঙ্গে কথা বলেন।
 
আলমগীর হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, নুর আলম রাজসাক্ষী হয়ে ২০ বছর ধরে জেলে আছেন জানার পর তাকে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে জামিন করিয়েছেন। খুলনার একটি মামলা তার প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট আছে বলে জানতে পেরেছি। সেখানকার আইনজীবীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। ওই প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট প্রত্যাহার হলেই তিনি কারামুক্ত হবেন।
 
তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে আছে নুর আলম। তিনি কারাগারে থাকাবস্থায় তার ছেলে রাফী (১৮) মারা গেছেন। স্ত্রীর বিয়ে হয়েছে অন্য জায়গায়। বাড়িঘর জমিজমা এখন কিছুই নেই। প্রথম জীবনে নুর আলম জাহাজে চাকরি করতেন। সেই চাকরি ছেড়ে তিনি এরশাদ শিকদারের বডিগার্ড হিসেবে যোগ দেন। নুর আলম চট্টগ্রাম জেলার সন্দীপ থানার আজিমপুর গ্রামের বাসিন্দা।
 
উল্লেখ্য, এরশাদ শিকদারের জন্ম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার পিতার নাম বন্দে আলী শিকদার। ১৯৬৭ সালে তিনি তার জন্মস্থান নলছিটি থেকে খুলনায় চলে যান। কিছুদিন পর রেলস্টেশনের কুলির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে রেললাইনের পাত চুরি করে বিক্রি করত এমন দলে যোগ দেন। পরে তিনি তাদের নিয়ে নিজেই একটি দল গঠন করেন এবং এলাকায় রাঙ্গা চোরা নামে পরিচিতি পান। মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই ১৯৭৬ সালে এরশাদ শিকদার রামদা বাহিনী নামে একটি দল গঠন করেন। যারা খুলনা রেলস্টেশন ও ৪ নম্বর ঘাট এলাকায় চুরি-ডাকাতি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। এই রামদা বাহিনী নিয়েই এরশাদ ১৯৮২ সালে ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকা দখল করেন এবং এর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এরশাদ শিকদার বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর এরশাদ শিকদার আবারও দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কিন্তু সমালোচনার মুখে কিছুদিন পরই আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৯৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার সময়ও এরশাদ শিকদার ওয়ার্ড কমিশনার ছিলেন।


রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর এরশাদ আরও ক্ষমতাসীন হয়ে ওঠেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত খুলনার রেলওয়ের সম্পত্তি এবং জোরপূর্বক ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হন। ৬০টিরও বেশি হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন এরশাদ শিকদার। বডিগার্ড নুর আলম ২৪টি হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেন।