সাম্প্রতিক সংকট দূরীকরণে আলেমদের মতামত

সাম্প্রতিক সংকট দূরীকরণে আলেমদের মতামত
সাম্প্রতিক সংকট দূরীকরণে আলেমদের মতামত

নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

বাংলাদেশ বর্তমানে নানাবিধ সংকটের মুখোমুখি । সাম্প্রতিক সংকট দূরীকরণে আলেমদের মতামত নিন্মে উপস্থাপন করা হলো ।

অপকর্ম রোধে পরকালীন শাস্তির কথা তুলে ধরতে হবে
ধর্ষণের ঘটনা আজ প্রতিনিয়ত শুনতে পাচ্ছি। মিডিয়ায় তাকালেই ধর্ষণের খবর। শিশু, গৃহবধূ, ছাত্রী, শিক্ষিকা সবাই ধর্ষণের শিকার। দুই বছরের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধাও ছাড় পাচ্ছেন না। যেন ধর্ষণ মহামারী চলছে সমাজে। এ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে সবাইকে সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে। দায়িত্বশীলদেরকে জোরালো ভমিকা পালন করতে হবে।
বর্তমান সমাজে নৈতিকতা ও সুশিক্ষার বড় অভাব। এ কারণেই ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ধর্ষণের আরও একটি কারণ হলো তরুণ-তরুণীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসামাজিক কর্মকাÐে লিপ্ত থাকছে। এতে করে সহজেই তারা নোংরা কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাই অভিভাবককে সন্তানদের দেখভাল করা উচিত। প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে সন্তানের হাতে থাকা মোবাইলটি চেক করা প্রয়োজন। তা ছাড়া সে কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এমন কোনো পোশাক তাকে ক্রয় করে দেওয়া উচিত নয় যা দ্বারা অশ্লীলতা প্রকাশ পায়।
ধর্ষক যেই হোক, তার পরিচয় যাই হোক না কেন, তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। দ্রুত ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের বিচার করতে হবে। সঠিকভাবে বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজ থেকে ধর্ষণের অভিশাপ দূর করা যেতে পারে।
ধর্ষণ প্রতিরোধে আলেম সমাজও ভমিকা রাখতে পারেন। প্রতি জুমার দিনের খুতবায় আমরা পর্দার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করে মানুষকে আরও সচেতন ও আল্লাহমুখী করতে পারি। পরকালে ধর্ষকদের পরিণাম ও শাস্তির কথা আলোচনা করতে পারি। ব্যাপকহারে ধর্ষণের পরকালীন শাস্তির কথা তুলে ধরতে পারলে আশা করি মানুষের মাঝে আল্লাহর ভয় কাজ করবে। আর এভাবেই আমরা সবাই মিলে সমাজ থেকে ধর্ষণ নামক জঘন্যতা দূর করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

সুস্থতার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা নেই বলে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে
সুস্থতা আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। রাসুল (সা.) বলেছেন, কিছু নিয়ামত এমন আছে, যে ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। তন্মধ্যে একটি হলো সুস্থতা, অন্যটি অবসর। একই সঙ্গে ইসলামের শিক্ষা হলো আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত যখন মানুষ পায়, তখন সে নেয়ামতের
কৃতজ্ঞতা আদায় করবে। কৃতজ্ঞতা অর্থ হলোÑ আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত যে জন্য দান করেছেন, সে নেয়ামত সে জায়গায় ব্যবহার করা। তখন আল্লাহ তার নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দেন। আর যদি নেয়ামতকে কেউ অবজ্ঞা করে এবং তার যথাস্থানে ব্যবহার না করেÑ তাহলে আল্লাহ তায়ালা শাস্তির ঘোষণা করেছেন।
সুস্থতার নেয়ামত মানুষ ব্যবহার করবে তার পার্থিব কল্যাণে এবং পরকালীন কল্যাণে। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সমাজে এখন পার্থিব ও অপার্থিব কল্যাণের ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা দেখা যায়। এ জন্য আজকাল ডেঙ্গু-ক্যানসারসহ নানা রকমের ব্যাধি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে আছে, কখনও ডায়েরিয়ার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, কখনও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। আবার একই সঙ্গে ভয়াবহভাবে ক্যানসার বেড়ে গেছে। সুস্থতার নেয়ামত আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত পথে, দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণে আমরা পর্যাপ্ত ব্যবহার করছি না বলেই নানা রকম রোগব্যাধি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে শাস্তিÑ আমরা এর শিকার হচ্ছি।
আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে যে রোগব্যাধি দেন, এ সম্পর্কে সুরা বাকারার ১৫৫-১৫৭নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এর উদ্দেশ্যও বর্ণনা করেছেনÑ পার্থিব জীবনে এটা আল্লাহ তায়ালা দেন, তার কৃতকর্মের কারণেই দেনÑ সেটা হলো তার পরীক্ষার জন্য। এ রকম বিপদ-আপদে পড়ার পরে বান্দা কী করে। যদি তারা ফিরে আসে, তা হলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তারা রহমতপ্রাপ্ত হয়। মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ থেকে মুক্তি ও নিরাপদ জীবনের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে হবে। একই সঙ্গে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। সচেতন ও সতর্ক থাকা শুধু পার্থিব বিষয় না বরং এগুলো মানুষের ধর্মীয় কর্তব্যের আওতায় পড়ে। বিশেষ করে নিজে পরিষ্কার থাকা, চারপাশ পরিষ্কার রাখা।
ময়লা-আবর্জনা আমাদের শহুরে জীবনে ভয়ঙ্কর রকম ব্যাধি। যেখানে আবর্জনা আমাদের দূর করে সরিয়ে দেওয়ার কথা সেখানে আমরা এমন জায়গায় ফেলিÑ তাতে রাস্তাঘাট আবর্জনা হয়ে গন্ধ ছড়ায়। পথ চলতে নগদ কষ্ট হওয়া ছাড়াও চিরস্থায়ী ক্ষতি হয় আবহাওয়া দূষিত হয়ে। যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর রকমের বিপদের সম্মুখীন করে। অথচ রাসুল (সা.) পবিত্রতাকে ঈমানের অঙ্গ বলেছেন। তাই বলিÑ ইসলামের এই বিষয়গুলো যদি কেউ ধারণ করতে পারে তাহলে সহজেই আমরা সুস্থ জীবন লাভ করতে পারি।

পানিতে ধুয়ে-মুছে যাক আমাদের পাপ
বছরের পর বছরের অভিজ্ঞতা হলো রমজান মাস শুরু হলে প্রকৃতি ঠান্ডা হয়ে যায়। রহমতে পরিপূর্ণ হয়ে আরামের সঙ্গে রোজা রাখা হয়। এবার তা হলো না। পুরো রোজার মাস কাটলো অসহনীয় গরমে। দীর্ঘ গরমের পর শুরু হলো বৃষ্টি। তারপর তা রূপ নিল অতি বৃষ্টিতে। ফলে উজানের টানাবৃষ্টি আমাদের দেশে বন্যা হয়ে এল। ডুবে গেল গ্রামের পর গ্রাম। ৩৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে এটা কি শুধুই প্রাকৃতিক বিষয়? নাকি এর পিছনেও প্রকৃতির মালিক আল্লাহর হুকুম রয়েছে! মুসলিম হিসেবে কোরআনের কথা বিমা কাসাবাত আইদিন্নাসঅর্থাৎ হাতের কামাই এটাকে অস্বীকার করতে পারি না।
এ বিপর্যয়, এ বন্যা, এ মহামারী, এ গজব সবই আমাদের পাপের ফসল। অল্প পাপ তো রাহমানুর রাহিম দয়ালু আল্লাহ মাফ করে দেন, কিন্তু পাপের মাত্রা যখন বেড়ে যায় তখন তিনি আর সহ্য করেন না। কখনও ভমিকম্প, কখনও জলোচ্ছ¡াস আবার কখনও বন্যার মাধ্যমে কঠিনভাবে সতর্ক করেন। যেন আমরা তাওবা করে আবার সঠিক পথে আসতে পারি।
কয়েক মাস যাবত পত্রিকায় পাপের সংবাদ ছাপতে ছাপতে আর যেন ছাপাতে চাচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ। তবু আমরা যেন এসব অন্যায়েই ডুবে আছি। তাই বন্যা আবার দ্বিতীয় মাত্রায় আক্রমণ করেছে। আমরা অন্যায় বন্ধ না করলে অন্যা কোনো আজাব হয়তো আরও কঠিনভাবে আসবে। এই আজাব আসে আমাদের পরীক্ষার জন্য। আমরা যদি ফিরে না আসি পাপ থেকে, তাহলে একদিন হয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে সব কিছু। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করি এই বন্যার পানিতে যেন আমাদের পাপ ধুয়ে-মুছে যায় এবং পাপমুক্ত এক জীবন পাই আমরা।
বন্যার সময়ে আমাদের করণীয় ১. অন্যায় থেকে এখনই তওবা করা; ২. অন্যায়ের উপকরণগুলো নষ্ট করে দেওয়া; ৩. যারা বন্যায় কবলিত আছে তাদের মুক্তির জন্য দোয়া করা; ৪. বন্যার্তদের মাঝে আর্থিক ও খাবার সাহায্য স্বতঃস্ফর্তভাবে পৌঁছে দেওয়া; ৫. বন্যার্তদের আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ থাকলে নিজেদের বাসাবাড়িতে আশ্রয় দেওয়া; ৬. পরতবর্তী ফসল না আসা পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সাহায্য অব্যাহত রাখা; ৭. পরবর্তীতে যেন বন্যা না আসে সে জন্য বাঁধ যেমনভাবে ঠিক করতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে তাকওয়ার বাঁধকেও ঠিক করতে হবে। যেন গুনাহের কারণে আমরা আর কোনো আজাবে পতিত না হই।

যার যার অবস্থান থেকে ক্ষতিসমূহ তুলে ধরতে হবে
গুজবের নামে নানা অপরাধ হচ্ছে সমাজে। বিশেষ করে কল্লা কাটা ও ছেলেধরা গুজবে অনেক নিরপরাধ মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছেন। যা ইসলাম আদৌ সমর্থন করে না। ইসলামে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা যেমন হারাম, তেমনি গুজব ছড়ানোও নিষিদ্ধ। গুজব সাধারণত তথ্য সরবরাহ ও তথ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। তাই তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। নিজ কানে শুনে, চোখে দেখে তবেই কিছু প্রকাশ করতে পারি বা বলতে পারি। অন্যথায় নয়। সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।
সমাজে কেউ গুজব সৃষ্টি করে অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে। গুজব ছড়িয়ে কোনো রকমের অরাজকতা সৃষ্টি করা অন্যায়। মিথ্যা তথ্য দিয়ে অন্যের হেয়প্রতিপন্ন করা জঘন্যতম অপরাধ। তাই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। জেনে বুঝে কেউ শয়তানের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনমুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজরাত : ৬)
বর্তমানে অনেক মানুষ মিথ্যা তথ্য প্রচার করে যেন আরাম পায়। তারা অন্যকে নীচু করতে চায়। অন্যের গিবত-চোখলখুরি করে আনন্দ পায়। মনে হয় এটাই তাদের প্রধান কাজ। অথচ নিজের ভেতরে দোষের অভাব নেই। এই শ্রেণির লোক গুজব ছড়িয়ে দেশের অবস্থানকেও খাটো করতে চায়, দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। তাই
আমাদের প্রত্যেকের অবস্থান থেকে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের প্রতিহত করা চাই। প্রত্যেকে যারা যার অবস্থান থেকে গুজবের ইহ ও পরকালীন ক্ষতির দিকসমূহ সম্পর্কে আলোচনার করলে এ থেকে সহজে মুক্ত হওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।

সুত্রঃ সময়ের আলো ।