মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক ঝর্ণা সাবধানে ভ্রমণ করুন

৪ বছরে নিহত ১০, আহত শতাধিক পর্যটক

মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক ঝর্ণা  সাবধানে ভ্রমণ করুন
ভ্রমণ পিপাসুদের তৃষ্ণা মিটায় মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক ঝর্ণা

নিজস্ব প্রতিবেদক ।। মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা ঝর্ণাগুলো এখন মৃত্যু কুপে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে বহু পর্যটক। একের পর এক দূর্ঘটনা ঘটলেও ঝর্ণাগুলোতে নেই প্রশাসনিক কোন নিয়ন্ত্রণ।

গত ৪ বছরে ১০জন পর্যটক নিহত ও আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। অভিজ্ঞদের মতে, একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

জানা গেছে, নজরকাড়া পাহাড়ি প্রাকৃতিক ঝর্ণার কারণে মিরসরাইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঝর্ণা দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসছেন। বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামে এসব ঝর্নায়। উপজেলার নয়স্তর বিশিষ্ট খইয়াছরা, নাপিত্তাছরা, সহস্রধারা, মহামায়া, বাওয়াছরা, রূপসী ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্না, হরিণাকুন্ড ঝর্না, সোনাইছরি ঝর্ণা নজর কেড়েছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের। তবে ঝর্ণাগুলোতে প্রশাসনের কোন নজরদারী না থাকাতে একেরপর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। তবুও ঝর্ণার পানিতে একটু শরীর ভিজিয়ে নিতে ছুটে যাচ্ছেন শতশত মানুষ।

সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট উপজেলার বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণার কূপে ডুবে নিহত হয় মেহেদী হাসান প্রান্ত (২১)। মেহেদী হাসান নাটোর জেলার নাটোর উপজেলার জালালাবাদ গ্রামের মো. নুরুল আমিনের ছেলে। তারা চট্টগ্রাম শহরের কর্ণেলহাট প্রশান্তি আবাসিক এলাকায় থাকতো।

ভ্রমণ পিপাসুদের তৃষ্ণা মিটায় মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক ঝর্ণা

গত ২৬ জুলাই খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেখতে এসে ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে নাম আবু আল হোসাইন মেমোরী (২৯) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। তার বাড়ী বগুড়া জেলার বগুড়া সদর থানায়। সে ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় সেইফটি কনসালটেন্ট বিডি প্রতিষ্ঠানের আর্কিটেকচার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতো।

২৮ জুন খৈয়াছড়া ঝর্নায় আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটক উপর থেকে পড়ে নিহত হয়। সে ফেনী সদরের আব্দুল মজিদের পুত্র। গত ২ এপ্রিল খৈয়াছড়া পাহাড়ি এলাকায় ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে মো. আশরাফ হোসেন (৩০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আশরাফ ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মৃত নাজিম উদ্দিনের সন্তান।

১৭ জুলাই মহামায়া লেকের পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয় শাহাদাত হোসেন (২২) নামে এক যুবক। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল ১৯ জুলাই শাহদাতকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। তার বাড়ী মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নে। গত বছরের ১৫ আগস্ট নয়দুয়ারিয়ার নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। সে ফকিটছড়ি উপজেলার নিরঞ্জন দে’র ছেলে।

একই বছরের ২৪ আগস্ট বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণায় উপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। তার বাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া এলাকায়। ওই বছরের ১৫ জুলাই খৈয়াছরা ঝর্ণার সাতটি স্তরের ৫ম স্তরে উঠার পর স্থানীয় এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরতে যায় ওয়াসিম আসগর। ওই পর্যটক সামান্য আঘাত পেলেও ওয়াসিম পাহাড়ের নিচে পড়ে যায়। এতে মারাত্মক আহত হয় সে।

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর উপজেলার নাপিত্তছরা ঝর্ণায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুন (২২) মৃত্যু হয়। সে ফেনী জেলার শৈর্শদী এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে। ১২ জুলাই উপজেলার বোয়ালিয়া ঝরনা দেখতে এসে আটকা পড়ে ১৫ পর্যটক। চারঘণ্টা চেষ্টার পর তাদের উদ্ধার করে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। এছাড়াও ঝর্ণার উপর থেকে পড়ে আহত হয়েছে আরও অর্ধশত।

শুভ সংঘের মিরসরাই উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাঈম বলেন, কোন রকম পাহাড়ি ঝিরি পথে চলার ট্রেনিং না নিয়ে ঝর্ণাগুলো দেখতে আসা খুবই বিপদজনক এর জন্যে অবশ্যই ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন আছে। তাছাড়া মিরসরাইয়ের সামাজিক সংগঠনগুলো ঈদের ছুটিতে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিটলেট বিতরণ করতে পারলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।

বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) সভাপতি মো. সরওয়ার উদ্দিন বলেন, আমরা পর্যটকদের জন্য সচেতনতা মূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করেছি। খৈয়াছরা, সহস্রধারা, নাপিত্তা ছরা, লবণাক্ষ ছরা, বাওয়া ছরা, কমলদহ ছরা, সোনাই ছরা ঝর্ণা এলাকায় নিরাপদে যাওয়ার জন্য ২০ জন ইকো গাইডকে নিয়োগ দিয়েছি। পর্যটকরা যদি ঝর্ণা এলাকায় যাওয়ার সময় ইকো গাইডদের সাথে নিয়ে যায় তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

খইয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, মূলত দায়িত্বহীনতা ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকে ঝর্ণার উপরে উঠে সেলফি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর ষ্টেশন অফিসার মো. তানভির আহম্মদ বলেন, ঝর্নাগুলোতে প্রশাসনের নজর দেয়া প্রয়োজন। পর্যটকদের গাইড দিতে হবে কোন স্থানে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে, কোন স্থানে গেলে নিরাপদ তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।

মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জসীম উদ্দিন বলেন, মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে সৃষ্ট ঝর্ণা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাকারো পর্যটক আসে। ঝর্ণা এলাকাগুলোতে যদি পর্যটন মন্ত্রণালয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে তাহলে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব। এখানে কোন নিরাপত্তা না থাকায় ইতমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা পর্যটন এলাকগুলোতে বিপদনজক স্থান চিহ্নিত করে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শীঘ্রই সর্তকতামূলক সাইনবোর্ড দিবো।