সংগ্রাম

সংগ্রাম
সংগ্রাম

হৃদয় হাসান বাবু  ।।

অ কানছনের মা কই গেলা, ভাত দেও দিহি, ম্যালা খিদা পাইছে। চাইড্ডা খাইয়া ইট্টু জিরাইয়া লই। ম্যালা কাম পইরা রইছে বেলা পরনের আগই আবার ক্ষেতে যাইতে হইবো। চাষাবাদের জমিন থেকে ফিরে রইছদ্দি ঘরের পশ্চিম কোণের পুকুরে হাত মুখ ধুতে ধুতে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে এক নাগাড়ে কথাগুলো বলেই তবে ক্ষেমা দেয়।

রইছদ্দির স্ত্রী জোলেখা বানু স্বামীর সব কথাই শুনে কিন্তু কোন জবাব দেয় না। চুলোয় রান্না চলছে। লাক্‌ড়ির চুলা। লম্বা নল দিয়ে চুলার আগুন বৃদ্ধি করার জন্য ফুকের পর ফুক দিতে থাকে, মাটির চুলোয় দেয়া লাক্‌ড়ির কাঠ সামান্য ভিজা থাকায় আগুন কম জ্বলছে। সকাল বেলা থেকে ঘরে রান্না করার মতো চাল ছিলো না। কিভাবে কি করবে তাও ভেবে কুল কিনারা পায় না জোলেখা। এদিকে স্বামীকে তা জানতে দেয় না পাছে শেষ মুহূর্তে জানিয়েছে বলে সোয়ামী রাগারাগি করে এই ভয়ে। ভোর বেলায় স্বামী যখন পাশের গেরামের রশিদ মেম্বারের জমিতে কামলা খাটতে চলে যায় তখন উপায়ান্তর না দেখে বাড়ির এক মহাজনের বউয়ের কাছ থেকে চুপিচুপি কিছু চাল ধার করে আনে ক’দিন পর দিয়ে দিবে বলে।
মহাজন লোকটা বড়ই বদ খাছলতের। মেয়ে মানুষ দেখলেই কেমন চুক চুক করে তাকায়। গ্রামের গরীব-অসহায় মানুষদের বিপদের স্বঘোষিত বন্ধু। গরীব মানুষগুলো বিপদে পড়লে, টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে সেই সুযোগে মহাজন তাদের কড়া সুদে টাকা ধার দেয়। কেউ সময় মতো দেনা শোধ করতে না পারলে তার কপালে খুব বিপদ আছে। জোর করে হয়তো জায়গা জমি লিখে নেয় নয়তো তার পোষ্য সণ্ডা মার্কা লোকগুলো ঘরে যা আছে তা রেখে দিয়ে জোর করে ঘর থেকে অসহায় মানুষটাকে পরিবার সমেত বিতাড়ন করে। মহাজন এতো খারাপ প্রকৃতির লোক যা বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু মহাজনের বড় বউটার হয়েছে খুব দয়ালু ও সরলমনা দিল। তার বংশ মর্যদাও খুব উঁচু। ঘটকের কথায় ভালো ছেলে পেয়েছে মনে করে ত্রিশ বছর আগে মহাজনের সাথে ঘটা করে বিয়ে দেয় রাবেয়া আক্তারের পিতা জাগির সর্দার। মহাজনের তিন গ্রাম পরে রাবেয়ার বাপের বাড়ি। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন না যেতেই মহাজনের আসল রূপ উন্মোচিত হতে লাগলো। মানুষ হোক আর অমানুষ হোক তখন আর করার কিছুই থাকে না। বিয়ে নামক বন্ধনের গ্যাড়াকলে পড়ে যায় জাগির সর্দারের পরিবার। এদিকে সংসারের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া খাতুন সব কিছু মুখ বুঝে মেনে নেয়। মাঝে মধ্যে স্বামীকে এসব ছেড়ে ছুঁড়ে মানুষের প্রতি নরম হতে পরামর্শ দেয় কিন্তু মহাজন রাবেয়ার কথা এক কানে শুনে অন্য কানে বের করে দেয়। আবার অনেক সময় পরামর্শের কথা শুনে রাবেয়ার মুখের উপর বলেও দেয়, “মাইয়াগো কথায় কান দেয়া মানে তাগো পরামর্শে দুনিয়াদারি চলন যাইবো না। মাইয়ারা হইছে সংসারের সৌন্দর্য পুতুল, তাগোর কথায় চলন নাই।” স্বামীর এই কথা শুনে চুপ করে যায় রাবেয়া খাতুন। কোন প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান হলো মহাজন। তেমনি তার বাবাও ছিলেন তার দাদার একমাত্র সন্তান। সেই হিসেবে মহাজন বাবা-দাদার রেখে যাওয়া প্রচুর সহায় সম্পত্তি পেয়েছে। তার জমানায় এসে কূ্‌টবুদ্ধির জোরে সেই সম্পত্তি আরো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ছোট বেলায় প্রচন্ড দুষ্ট স্বভাবের ছিলো বিধায় তেমন লেখাপড়া করেনি। বাপ-দাদার প্রচুর সহায়-সম্পত্তি থাকার কারণে কোন অভাব না থাকলেও তার স্বভাব ছিলো চুরি করা। দলবল নিয়ে আজ এর মুরগী চুরিতো কাল আরেক জনের নারকেল গাছের ডাব সাবাড়, রাতের অন্ধকারে পুকুরের মাছ চুরি করে পরদিন অন্য গ্রামের বাজারে বিক্রি এগুলো ছিলো তার নিত্য দিনের কীর্তি। যদি কেউ টের পেতেন মহাজন এই কুকর্মটি করেছে তবে বেশীর ভাগই ঘটনা চেপে যেতেন। আর একেবারে অসহায়-অপারগ হয়ে কেউ যদি তার বাবার কাছে নালিশ নিয়ে যেতো তবে কোন বিচার না করে বা ক্ষতিপূরণ না দিয়ে এই বয়সে ছেলেরা একটু আধটু এমন করে বলে উল্টো তিরস্কার করে ঐ ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিতো। এই করে করে তার লেখা পড়াও চাঙ্গে উঠেছে। এই কোন মতে পড়তে লিখতে পারার মতো সপ্তম শ্রেণি পাস দিয়েছে। তাও প্রতি ক্লাসে দু-এক বার ফেল করে তবেই পরবর্তী বছরে কোন মতে পাসের তালিকার সর্বশেষে গ্রেস মার্ক দিয়ে তার নাম সংযোজিত হতো। এতেই সে মহা খুশি। এই পাশ করাটাও স্বাভাবিক ছিলোনা। বাপ-দাদার ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির দাপটে তাদের অনুরোধ রাখতে গিয়ে অনেক সময় স্যারেরা তাকে টেনে টুনে পাস করিয়ে দিতে বাধ্য হতেন। প্রায় প্রতি ক্লাসে দু-একবার ফেলের কারণে আড়ালে আবড়ালে অনেকেই তাকে ফেলটুশ মামা বলে খেতাব দিয়েছে। তবে প্রকাশ্যে সে কথা বলতে সাহস করতো না কেউ কারণ ছোট বেলা থেকেই মহাজন খুব বদ স্বভাবের জন্য গ্রামে কুখ্যাতি অর্জন করেছে।
চুলোয় ঘন ঘন ফুঁক দিয়েই চলছে জুলেখা। লাক্‌ড়ি ভিজা হওয়ায় আগুন কম তবে ধোঁয়ায় রান্না ঘর অন্ধকার হয়ে গেছে। এমনিতেও দেরি করে চুলোয় রান্না বসিয়েছে তার উপর আবার লাক্‌ড়ি ভালোভাবে জ্বলছেনা। ধার করে আনা সেই চালেই রান্না চলছে চুলোয়। তাই একটু দেরি হয়ে গেছে। অন্যদিন আরো আগে রান্না হয়ে যায়। আর হবেইবা না কেন? একটা তরকারী, আর লবণ দিয়ে ভাত এইতো খাদ্য তালিকা। অভাবের সংসারে ক্ষিধা নিবারণ করার জন্য কোন মতে পেটে দুটো দানাপানি চালান করে দিতে পারলেই হয়। ছেলেটার জন্যেই যা একটু চিন্তা। ওর পাতে একটু ভালো মন্দ দিতে পারলেই তাদের মনটা শান্তি হয়। তবে ছেলেটাও হয়েছে খুব সাদা সিধা, লোভনীয় খাবার হোক আর অন্য কিছু হোক কোনকিছুর প্রতি তার কোন লোভ বা আগ্রহ নেই। ঐটুকুন ছেলেও যেন বাবা-মায়ের কষ্ট বুঝতে শিখেছে।
রইছদ্দি বেশ কিছুক্ষণ হলো হাত-মুখ ধুয়ে খাবারের আশায় বসে আছে। ১০/১৫ মিনিট পেরিয়ে গেছে এখনো খাবার সামনে আসে না। এটা যেন তার কাছে ব্যতিক্রম ঠেকে। সচরাচর এভাবে কখনো হয় না। দুপুরে ক্ষেতের কাজ বন্ধ করে এলেই হাত মুখ ধুতে ধুতে সামনের রুমে খাবার চলে আসে কিন্তু আজ ১৫ মিনিট পেরিয়ে গেলো খাবার আসার খবর নেই। তাই কিছুটা খট্‌কা লাগে। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এবার হাক ডাক শুরু হয়। কই গেলা কানছনের মা। কই আইজ কি খাওন টাওন কিছু দিবা না নাকী উপোস করুম! হেই কোন সময় থাইক্কা বইসা আছি তোমার কোন খবর নাই। কি হইলো কিছু কইবার লাগছোনা ক্যা? সোয়ামী হাত ধুয়ে খাবারের আশায় বসে আছে কিন্তু এখনো রান্না শেষ হয়নি। জোলেখার খুব খারাপ লাগে তবুও কোন জবাব দেয় না। কারণ করার কিছু নাই। এদিকে অপেক্ষা করার পরেও পাকের ঘর থেকে কোন জবাব না পেয়ে, “তুমি খাওন দিলে দ্যাও না দিলে না দ্যাও আমি ইট্টু পিঠটা বিছানায় লাগাইয়া বিশ্রাম লই।” এই কথা বলতে বলতে রইছদ্দি পাটির বিছানায় শুয়ে পড়ে। রান্না হয়ে এলে জোলেখা তাড়াতাড়ি প্লেটে বেড়ে স্বামীকে ডেকে তুলে। আজ একমাত্র তরকারি শজনে পাতা শাক। তরকারির বাহার দেখে রইছদ্দি বুঝতে পারে আজ ঘরে কিছু নাই। মুখে কিছু বলেনা শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এটা তার অসহায়ত্বের করুণ দীর্ঘশ্বাস। ছেলেটা স্কুলে গেছে। কিছুক্ষণ পরে ছুটি হবে। তারা স্বামী-স্ত্রী লবণ দিয়েও ভাত খেতে পারবে কিন্তু ওইটুকুন ছেলেটা এই শজনে পাতা দিয়ে খাবে এটা মনে হতেই কষ্টে কলিজ্বাটা ছিড়ে যেতে চায়। কিন্তু করার কিছুই নাই। এর চেয়ে বেশী জোগাবার সাধ্য যে তার নাই। অভাবের সংসার নুন আনতে পান্তা ফুঁরায়।
রইছদ্দির ভালো নাম রমিজ উদ্দিন। ছোটকালে বাবা-মা অনেক টাকা খরচ করে আক্বিকা দিয়ে নাম রেখেছিলেন রমিজ উদ্দিন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় অভাব অনটনে পড়ে সমাজের নিচু তলায় অবস্থান করার ফলে এক সময় বাবা মায়ের রেখে যাওয়া সেই নাম ক্ষয়ে ক্ষয়ে এখন রইছদ্দি তে এসে থেমেছে। রইছদ্দি ও জোলেখার একমাত্র ছাওয়াল দশ বছর বয়সী কামরুদ্দিন ডাক নাম কাঞ্চন ক্লাস ফাইভে পড়ে। এই অভাবের টানাটানি সংসারেও খেয়ে না খেয়ে হলেও জোলেখা তার একমাত্র সন্তানকে লেখাপড়া করাবে। জোলেখার খুব শখ ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে বড় অফিসার বানাবে। আশপাশের লোকজন তার ছেলেকে দেখলে সালাম দিবে, কুর্ণিশ করবে। আর তা দেখে জোলেখার প্রাণটা জুড়িয়ে যাবে। শুধু তাই নয় সম্মানের সাথে সাথে তার সন্তান স্বচ্ছলতার মুখও দেখবে। জোলেখা আর রইছদ্দির দুঃখের দিন শেষ হবে। বৃদ্ধ বয়সে হলেও একটু আরাম-আয়েশ করে শান্তিতে মরতে পারবে। এই তাদের স্বপ্ন। কিন্তু জোলেখা জানে এই সুখ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে কঠোর সাধনা ও সংগ্রাম করতে হবে। অভাব-অনটনের প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে তার একমাত্র সন্তানকে লেখা পড়ায় শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে একদিন খাবে অন্যদিন উপোষ করবে তবুও এই সাধনা থেকে পিছ পা হবে না। এটাই জোলেখার কঠিন শপথ। স্ত্রীর এই চাওয়ার সাথে মনে মনে রইছদ্দিও একমত। তবে মুখ ফুটে কিছু বলে না। রইছদ্দি নিজেও চায় তার একমাত্র ছেলেটি একদিন অনেক বড় শিক্ষিত হোক। দশ গেরামের মানুষ তাকে এক নামে চিনবে। তাগো এই অজ পাড়া গাঁয়ের নাম দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়বে। নিজেরা তেমন লেখা পড়া না করলেও ছেলেকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। জোলেখা বানুর এই চাওয়ার সাথে রইছদ্দির কোন দ্বিমত নেই। মনে মনে স্ত্রীর সংকল্পে রইছদ্দি খুব খুশী। সেও চায় তার সন্তান একদিন সু-শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে। সমাজের উঁচু তলায় অবস্থান করবে। তারা স্বামী-স্ত্রী গর্ব করে বলতে পারবে অভাব-অনটন তাদের জীবনকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরঞ্চ অভাব অনটন তাদের সংগ্রামকে আরো গতিময়-বেগবান ও শাণিত করে তুলেছে। ছেলেটাও যেন গরিব বাবা-মায়ের মনের ভাষা বুঝতে পারে। সেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করছে। ৫ম শ্রেণিতে উঠা পর্যন্ত প্রতি ক্লাসেই কামরুদ্দিন মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে। কোন ক্লাসে তাকে দ্বিতীয় হতে হয়নি। অত্যন্ত মেধাবী এই কামরুদ্দিনকে স্কুলের প্রতিটা শিক্ষকই খুব স্নেহ করেন। তার পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা তারা সবাই জানেন তাই সবাই তাকে যথাসাধ্য বিভিন্নভাবে বিনা পয়সায় সহায়তা করেন। এটা ওটা শিখিয়ে পড়িয়ে সহায়তা করেন। শিক্ষক সমাজে এখনো কিছু কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন যারা নাকি শিক্ষাকে মানুষ গড়ার কারিগরের মহৎ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, অন্য অনেকের মতো তারা এ পেশাকে ব্যবসায় পরিণত করতে চান না। শিক্ষা অন্তঃপ্রাণ হয়ে নিরলস সেবা দিয়ে যান। তাদের এহেন মহানুভবতার জন্য মানবতা এখনো বেঁচে আছে।
রইছদ্দির কর্জ গলায় গলায় হয়েছে। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় গত দুই মাস কাজ একেবারে নেই বললেই চলে। জমিনে বর্ষার পানি টইটুম্বুর করছে। তাই ক্ষেতের জমিনে কোন কাজ নেই। এই গ্রামের ও অন্যান্য জেলা থেকে আসা কামলারাও বেকার বসে আছে। অনেকে বর্ষা সিজনের জন্য একেবারে বেকার হয়ে যাওয়ায় নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছে। মাটিকাটা, ধান বোনা, জালায় পানি দেয়া, ধান কাটা, ক্ষেতে নিড়ানী দেয়া, মাছ ধরা, ঘরের টিনের চালা বানানো, রাজমিস্ত্রীর জোগালি দেয়া সহ হেন কাজ নেই যা রইছদ্দি পারে না। ক্ষেতে সবসময় কাজ থাকে না তাই জীবন ধারণের তাগিদে রইছদ্দিকে এই কাজগুলোয় অভ্যস্থ হতে হয়েছে। প্রথম প্রথম শরীর মন বিদ্রোহ করতে চাইতো কিন্তু একসময় ছেলে-বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এখন বর্ষাকাল এসে যাওয়ায় কাজ কর্ম নেই। টাকা আয়ের রাস্তা বন্ধ। অন্য কোন খাত থেকে যে টাকা আসবে তাও নয়। ঝাড়া হাত-পা, বসে বসে খাচ্ছে। একমাত্র আদরের ধনকে নিয়ে তিন জনের সংসার। প্রতিদিনতো খাওনের জন্য হলেও কিছু খরচ হচ্ছে। ঘরে একটা টাকা নেই। তারা দু’জন খেয়ে না খেয়ে কোন মতে চলছে কিন্তু ছেলেটাকে কোন কিছুর কমতি বুঝতে দিতে চায় না। তার খাবার থেকে শুরু করে পড়ালেখায় যাবতীয় কিছু যোগান দিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন মহাজনের বড় বউয়ের কাছ থেকে ধার করে এটা ওটা এনে সংসার চালিয়েছে। কিন্তু সেখানেও একদিন ছোট বউ দেখে ফেলায় চোটপাট করে তখন থেকে ওভাবে আনার রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট বউটি হয়েছে যাকে বলে সাক্ষাৎ দজ্জাল। মনে দয়া মায়া বলতে কিছু নেই। কিন্তু বড় বউটি একেবারে মাটির মত। অভাব অনটনে আর টিকতে না পেরে একদিন মহাজনের স্মরণাপন্ন হয়। রইছদ্দির বয়সতো বেলায় বেলায় কম হলো না। সেই ছোটকাল থেকে দেখছে অভাব অনটনে পড়ে যারাই মহাজনের দ্বারস্থ হয়েছে একসময় দেখা গেছে জায়গা-জমি বিক্রি করে, না হয় মাথা গুঁজার ঠাঁইটুকু বিক্রি করে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গ্রাম ছেড়ে তাদের চলে যেতে হয়েছে। একদিন আর টিকতে না পেরে জোলেখা সোয়ামীকে বলেই বসে ঘরেতো খাওনের কিছু নাই। পোলাডা স্কুল থাইক্যা আইয়া কিছু খাইবার পারবো না। তুমি ইট্টু মহাজনের কাছে যাইবা? আল্লায় কপালে যাই রাখছে তাই অইবো, আমি বাঁইচ্চা থাকতে পোলাডারে খাওন-পিন্দনের কষ্ট পাইতে দিমু না। দরকার অইলে আমরা না খাইয়া থাহুম। পেডে পাত্থর বান্ধুম তবুও আমার সোনামণিরে উপোস থাকতে দিমু না। যাও তুমি ঐ মহাজনের কাছে যাও, এই ভাঙা ঘর-ভিটা বন্ধক রাইখা যা পাও নিয়া আইসো। জোলেখার বুক ভাঙ্গা ব্যথা রইছদ্দি বুঝে। কিন্তু সে নিরুপায়। কিন্তু অনেক কষ্টে রইছদ্দির ভাগে বাপের রেখে যাওয়া এই সামান্য ভিটা ও কুড়ে ঘর সে ছাড়তে পারবেনা। এটা যদি ছেড়ে দেয় তবে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? খেয়ে না খেয়েও অন্তত মাথা গুঁজার জায়গাটা আছে তখন মাথা গুঁজার কোন ছাদ থাকবে না। যাযাবরের মতো দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হবে। তাই শত কষ্টের মাঝেও রইছদ্দি ভিটা বিক্রি করতে রাজি হয় না। এই দিকে বেশ কিছু দিন হাতে কোন কাজ কাম না থাকায় রইছদ্দি এক প্রকার বসে বসে খেয়েছে। অতি সামান্য যা কিছু জমা ছিলো এ কয়দিনে তা তো ফুরিয়েছেই এখন হাতে কানা কড়িও নাই। জোলেখাও বুঝে এই ভিটা হারালে মাথা গুঁজার আশ্রয় থাকবে না। তাই তার মৃত মায়ের স্মৃতি স্বর্ণের হাতের বালা বের করে দেয় রইছদ্দিকে। এটা বিক্রি করে অন্তত কিছুদিন চলা যাবে। প্রথমে স্ত্রীর মায়ের স্মৃতি চিহ্নটুকু হারাতে না চাইলেও কোন উপায়ন্তর না দেখে অবশেষে রইছদ্দি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালা খানি নিয়ে মহাজনের কাছে যায়। বছর তিনেক আগে জোলেখা বানুর মা মারা যাওয়ার অন্তিম মুহূর্তে জোলেখাকে একটি স্বর্ণের বালা দিয়ে গিয়েছিলেন। মহাজনের কাছে সেটা বিক্রি করে অল্প বিস্তর যা পেয়েছে তা থেকে কর্জ শোধ করে বাকি টাকা দিয়ে কোন মতে এই দিনগুলি পার করে দিয়েছে। এর মধ্যে মরার উপর খঁড়ার ঘায়ের মতো হঠাৎ রইছদ্দি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অসুখ যেমন তেমন অসুখ নয়। রইছদ্দির মুখ ও পায়খানার রাস্তার মধ্য দিয়ে অনবরত রক্ত যেতে থাকে। প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি গ্রামের হাসপাতলে ছুটে যায়। ডাক্তার এই পরীক্ষা সেই পরীক্ষা করিয়ে অবশেষে ওষুধ দেয়। ব্লিডিং বন্ধ হওয়া পর্যন্ত কয়েকদিন হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরে আসে। রইছদ্দি টানা পঞ্চাশ দিন বিছানায় পড়েছিলো। এর মধ্যে ওষুধ পত্র কেনা, রইছদ্দিকে ভালো মন্দ দুটো খাওয়ানো সাথে ঘরের খরচ যোগাতে অবশেষে জোলেখাকেই মহাজনের দ্বারস্থ হতে হয়। জোলেখাকে তার সামনে দেখে মহাজনের চোখ-মন খুশিতে নেচে উঠে। মহাজন একই গ্রামের হলেও বিভিন্ন কাজ কামে হাতে গোনা কয়েকবার দেখেছে জোলেখা বানুকে। যতবারই দেখে ততবারই মনের মধ্যে ধুক্‌ ধুক্‌ করে উঠে। জোলেখাকে একান্ত করে পাওয়ার ইচ্ছে জাগ্রত হয়। কিন্তু কোন বারই দেখাটা দু’এক মিনিটের বেশী স্থায়িত্ব হয় না। নিজের বৈঠকখানায় জ্বলজ্যান্ত জোলেখাকে অসহায় অবস্থায় সামনে দেখে মহাজনের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। রূপে-গুণে জোলেখা মহাজনের দুই বউয়ের তুলনায় বেশ সুন্দরী। মহাজনের জিহ্বা যেন চুক চুক করতে থাকে।
যদিও জোলেখার তেমন বয়স হয়নি বড় জোর পঁচিশ কি ছাব্বিশ। তের চৌঁদ্দ বছর বয়সে রইছদ্দির সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। তখন জোলেখা ক্লাস সিক্স এ পড়ে। যাকে বলে বাল্য বিয়ে। এই সময়ের মতো তখন গ্রামে গঞ্জে বাল্য বিয়ে বন্ধে তেমন জন সচেতনতা ছিলো না। জোলেখা বয়সের তুলনায় শারীরিক গঠনে বাড়ন্ত শরীর। মোটামুটি সুন্দরী ছিলো বিধায় গ্রামের দুষ্ট, বখাটে ছেলেরা স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় জোলেখাকে খুব জ্বালাতন করত একবার হয়েছে কি জোলেখাকে এভাবে জ্বালাতন করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে জোলেখার তিন ভাইয়ের মধ্যে এক ভাইকে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছে বখাটদের হাতে। সে এক লম্বা কাহিনী।
প্রাইমারি পাস করে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে খুব ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে। স্কুলে মোটামুটি মাঝারী মানের রেজাল্ট জোলেখার জন্য বরাদ্দ। তবে গায়ের রঙ ও চেহারা সুন্দরের জন্য ছেলে বুড়ো সবার চোখে পড়ে। প্রতিদিনকার মতো জোলেখা সেদিনও স্কুলে যায়। রীতিমত ক্লাস করে বিকাল ৪টায় স্কুল ছুটি শেষে দুই সহপাঠীসহ বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। স্কুল আর বাড়ির দূরত্ব অর্ধ কিলোমিটার। গ্রাম বাংলার মানুষের জন্য এটা তেমন দূরত্ব নয়। প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে আসা যাওয়া করে জোলেখা। আজো তেমনি বাড়ির পথে রওয়ানা হয়েছে। স্কুল ডিঙ্গিয়ে কিছুদূর গেলেই বিশাল একটি ফসলের মাঠ। পাশ দিয়ে কুল কুল করে একটি খাল বয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা পানি কম থাকে কিন্তু বর্ষাকালে পানি টইটুম্বুর। রাতের আঁধারে খালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পানির শোঁ শোঁ আওয়াজে অনেক সাহসী ব্যক্তিও ভয় পেয়ে যায়। যারা একটু ভয় কাতুরে তারা দিন দুপুরেও পারতপক্ষে এই খালের পাশ দিয়ে রাস্তা মাড়াতে চায় না। প্রয়োজনে কিছুদূর ঘুরে বাজারের মাঝখান দিয়ে যাবে। খালের উপর ছোট্ট একটি ব্রিজ দিয়ে দুই গ্রামের যোগাযোগের সেতু বন্ধন। খালটা দুই গ্রামের মধ্যে সীমানা টেনে দিয়েছে। আলাদা করে রেখেছে দু’গ্রামের চাওয়া-পাওয়াকে। ফসল বুননের সময় এই খালের পানি নেয়াকে কেন্দ্র করে দু’পাড়ের দু’গ্রামের বাসিন্ধাদের মধ্যে প্রায় প্রতি বছরেই ঝগড়া বিবাদ সংঘটিত হয়। রক্তারক্তির ঘটনা যে কতোবার ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। বেশ কয়েকবার ব্রিজের অদূরে খালের পানিতে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছে গ্রামবাসী। ব্রিজের পাশে বেশ কিছু বাঁশ ঝাড় আর পাহাড়ী গাছ এলাকাটাকে ভৌতিক পরিবেশ করে রেখেছে। তার সাথে মিলিয়ে গ্রামবাসীর কবরস্থানটিও যেন সেখানে নিস্তব্ধতার ষোলকলা পূর্ণ করেছে। এমন নীরব, নিস্তব্ধ জায়গায় পৌঁছলে আগ থেকে লুকিয়ে থাকা ৪ জন মুখোশ বাঁধা সন্ত্রাসী ঘিরে ধরে জোলেখাদের। একজন জোলেখার নরম হাত চেপে ধরে রাখে অন্যরা তার স্কুল সহপাঠীদের তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে যেতে বলে। জোলেখার সহপাঠী দুই বান্ধবী ভয়ে কোন কথা বলে না। একজন কান্না করে বলে, ভাইয়া জোলেখাকে ছেড়ে দেন। তখন জোলেখাকে যে ধরে রেখেছে সে ধম্‌কিয়ে চুপচাপ চলে যেতে বলে অন্যথায় তাদের ক্ষতি করবে হুমকী দেয়। তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও বান্ধবীদের বাসার পথ ধরতে হয়েছে। জোলেখাকে কালো গ্লাসযুক্ত মাইক্রোতে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে বখাটেরা। জোলেখার দু’পাশে দু’বখাটে ও সামনে ড্রাইভারের পাশে একজন বখাটে বসা তাদের মাইক্রোর পিছু পিছু হোণ্ডা আরোহী অন্য দুজন বখাটে অনুসরণ করে আসছে। জোলেখাকে জোর করে টেনে হিচড়ে গাড়িতে তুলে নেয়ার পর ও বারবার মুখোশধারীদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে এবং তাকে কেন তুলে নিয়ে যাচ্ছে প্রশ্ন করে কিন্তু প্রতিবারই তাকে চুপ করে থাকতে শাসানো ছাড়া কোন উত্তর দেয় না মুখোশধারীরা। জোলেখা ভেবে পায়না তারা কারা এবং তাদের কি উদ্দেশ্য তা নিয়েও সে অন্ধকারে থাকে। জোলেখাদের গ্রামের উল্টো পথ দিয়ে কিছু দূর যেতেই বেশ কিছু গাড়ির জটলা দেখা দেয় নির্জন রাস্তার উপর। রাস্তা সরু হওয়ায় দু’পথের গাড়ি মুখোমুখী হয়ে জটলা বেঁধে গেছে। এর মধ্যে আয়নার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ফুলে ফুলে আচ্ছাদিত বরের গাড়ি। সম্ভবত দুপুরের খাওয়া দাওয়াসহ অনুষ্ঠান শেষে কনেকে নিয়ে বরযাত্রী ঘরে ফিরছে। জোলেখার মনে একটু আলোর রেখা দেখা দেয়। গাড়ির বহর যতোই কাছে আসতে থাকে জোলেখা যেন স্নিগ্ধ পরশ মাখানো বিকেলেও খানিকটা ঘেমে উঠে। বর কনের গাড়ি প্রায় সামনে এসে পড়ে এমন সময় দু’পাশ থেকে তাকে চেপে ধরা বখাটের কিছু বুঝতে না দিয়ে হঠাৎ জোলেখা চিৎকার করে উঠে সাইড ডোর চাপ দিয়ে হেঁচকা টানে খুলে মুহূর্তেই লাফ দিয়ে বর কনের গাড়ির সামনে রাস্তায় পড়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই জোলেখার এহেন সাহসীকতায় মুখোশধারীরা ভয় পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়াতে থাকে। পথচারিরা ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। জোলেখা রাস্তায় ভূপাতিত অবস্থায় চিৎকার করে বখাটেদের ধরার জন্য আকুতি জানাতে থাকে। উপস্থিত বরযাত্রী ও পথচারীরা জোলেখার চিৎকার শুনে সপ্রতিভ হয়ে উঠে ধাওয়া দিয়ে দৌড়রত বখাটেদের একজনকে আটক করে। এদিকে সঙ্গীদের অবস্থা বেগতিক দেখে পিছনে অনুসরণরত হোণ্ডারোহী দুজন পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে জনতা ধরে ফেলে। তিনজন বখাটেকেই জনতা প্রচণ্ড উত্তম মাধ্যম দেয়। সেকি মার, জীবিত দুজনকে আমৃত্যু ঐ মারের রেশ টেনে বেড়াতে হবে। তিন জনকে আধমরা অবস্থায় পরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এর মধ্যে তাদের নেতৃত্বদানকারী বখাটে উত্তেজিত জনতার বেমক্কা মারের আঘাতের লোড নিতে না পেরে দু’দিন হাসপাতালে কাটিয়ে অবশেষে মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনার কয়েক মাস পর একদিন রাতে জোলেখার এক ভাইকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন জোলেখার ভাইয়ের লাশ গ্রামের খালে ভাসতে দেখা যায়। যদিও থানা পুলিশ হয়েছে কিন্তু বছরের পর বছর মামলা চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই রহস্যজনক মৃত্যুর কোন কূল কিনারা করতে পারেনি। তবে গ্রামবাসীর ধারণা জোলেখাকে অপহরণ করার সাথে এই অপমৃত্যুর যোগসূত্র আছে।
দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে গেলো। অতি সাধারণ পরিবার রইছদ্দি ও জোলেখার আদরের সন্তান কামরুদ্দিন কাঞ্চন পড়ালেখা করে একদিন মানুষের মতো মানুষ হলো। দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাতে যে পরিবারের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হতো সেই পরিবারের মেধাবী সন্তান আজ দেশের একজন মস্ত বড় সরকারি অফিসার। শুধু তাই নয় তাঁর সততা আর কাজের সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশী সময় লাগেনি। ছেলের সুনাম খ্যাতির কারণে রমিজ উদ্দিন থেকে রইছদ্দিতে পরিণত হওয়া রমিজ আবার রমিজ উদ্দিন হিসেবেই তাঁর পরিচয় ফিরে পেলেন। ছেলের সাথে তাঁরা এখন রাজধানী ঢাকায় বিশাল সরকারি বাসভবনে থাকেন। ঘরে ছেলের একটি ফুটফুটে সুন্দরী বউ এসেছে। ছেলের বউ যেমন শিক্ষিত তেমন অমায়িক তার ব্যবহার। শ্বশুর-শাশুড়ির প্রয়োজনের দিকে সব সময় খেয়াল রাখে। ছেলের এমন নাম-ডাক দেখে রমিজ উদ্দিন আর জোলেখা বেগম এর সব দুঃখ-কষ্ট নিমিষেই মিইয়ে গেলো। ছেলের সুনাম নিয়ে তাদের গর্বের যেন শেষ নেই। রমিজ আর জোলেখার পরিবার সুখ-আনন্দে ভরে ওঠে। কঠিন সংগ্রামের জীবন পেরিয়ে স্বপ্নটা আজ সত্যিই বাস্তব।