মেহেরপুরের ‘মডেল খামার বাড়ি’র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল

রফিকুল আলম, মেহেরপুর ।।

মেহেরপুরের ‘মডেল খামার বাড়ি’র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল
রফিকুল আলম, মেহেরপুর

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জনপদ হলো মেহেরপুর। আয়তনে ছোট্ট এই জেলার কৃষি সকল মৌসুমে সবুজের সমারোহে ভরে থাকে। গোটা মেহেরপুরের সকল মাঠই যেন একেকটি প্রদর্শনী খামার। কৃষি উন্নয়নের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে মেহেরপুরে বিগত বছরের জানুয়ারি থেকে কর্মরত আছেন সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী ড. আখতারুজ্জামান। বর্তমানে পদে যোগদানের পর হতেই তিনি কৃষি সমৃদ্ধ মেহেরপুরের কৃষিকে অধিকতর উন্নয়নের সোপানে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কৃষি উন্নয়নের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক পদে মেহেরপুরে বিগত বছরের জানুয়ারি থেকে কর্মরত আছেন সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী ড. আখতারুজ্জামান। ড. জামানের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবনী কাজ হচ্ছে তার সরকারি অফিস চত্বরের সন্মুখস্থ পরিত্যক্ত জায়গাতে ‘মডেল খামারবাড়ি’ স্থাপন। বছরখানেক আগেও যে জায়গাটিকে পথচারীরা খামারবাড়ির পরিবর্তে ব্যঙ্গ করে জঙ্গলবাড়ি বলে কটূক্তি করতেন; কারণ কৃষি উন্নয়নের পথিকৃৎ সরকারি অফিসের সামনে যদি জঙ্গল আর ময়লা আবর্জনার স্তুপ থাকে তাহলে তাদের দিয়ে কৃষির কী উন্নয়ন হতে পারে এমন প্রশ্ন ছিল সাধারণ পথাচারী ও খামারবাড়িতে আগত মানুষদের মুখে মুখে। স্থাপিত হয়েছে নান্দনিক খামারবাড়ি মডেল, রাতে সেখানে শোভা পাচ্ছে অসংখ্য লাইটিং সাইনবোর্ড, এলইডি সাইনবোর্ড, পর্যাপ্ত সিকিউরিটি বাতি আরও কত কী!!

বস্তুত ঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সদর দফতরসহ প্রতিটি জেলা ও উপজেলা অফিসের মূল বিলবোর্ডে ‘খামারবাড়ি’ শব্দটি লেখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। সেই খামারবাড়ির নামকরণের বিষয়টি মাথায় রেখে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগের প্রথম উদ্যোগটির কথা বিবেচনা করে উপ-পরিচালক তার অফিস চত্বরের সামনে খামারবাড়ির একটা জীবন্ত মডেল তৈরি করেছেন।

এই মডেল খামারবাড়িতে আছে ‘পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ উত্তরে নলা দক্ষিণে কলা’ মেহেরপুরের প্রবাদ পুরুষ খনার এমন বচনকে বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয়েছে খামারবাড়ি মডেল। প্রবেশ পথের দুধার সুশোভিত করা হয়েছে দেবদারু বৃক্ষ দিয়ে। একটু এগুলো সামনে পড়বে কৃষকের ‘খামারবাড়ি”র মূল পাকা ভবন। ছোট্ট এই পাকা ভবনটির ছাদে শোভা পাচ্ছে ছাদ বাগান, আর বারান্দায় লাগানো হয়েছে মাটিবিহীন হাইড্রোপনিক সবজি। বাড়ির সামনের ফাঁকা উঠানটি বেশ পরিপাটি। উঠানের সোজাসুজি সামনের দিকে চিত্ত বিনোদের জন্যে রোপণ করা হয়েছে মৌসুমি ফুল ও সুদৃশ্য গাছ। এসব ফুল গাছে আধুনিক ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফুলবাগানে বসানো হয়েছে, চমকপ্রদ মৌবাক্স, সেখানে তৈরি হচ্ছে নির্ভেজাল মধু। বাড়ির প্রবেশ পথের বামে লাগানো হয়েছে গবেষণালব্ধ ১৩টি বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছ। বাড়ির পূর্বপাশে মিনি পুকুরের দক্ষিণে কালিকাপুর মডেল অনুসরণ করে পাঁচটি বেডে লাগানো হয়েছে পাঁচ রকমের সবজি। এই মডেল অনুসরণ করলে খামারি বছরের প্রতিদিনই তার এক শতক জমির এমন বাগান থেকে পাবেন এক কেজি করে কোন না কোন ধরনের সবজি যা তার পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পুরোপুরি মেটাবে। বাড়ির পূর্বপাশে ছোট্ট মিনি পুকুরে ভোরবেলা দারুণ পাঁপড়ি মেলে ফোঁটে লাল শাপলা। পুকুরে ছাড়া হয়েছে মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ। মা ছানা তেলাপিয়া মাছের জলকেলি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলে আপনার মন জুড়িয়ে যাবে। মিনি পুকুরটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ইচ্ছে পুকুর’ কারণ পুকুরের চারপাশ ইচ্ছেমতো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ফলদ বৃক্ষ ও সবজি দিয়ে। খামারবাড়ির পেছনে রয়েছে লতানো সবজি কুমড়ার মাচা। তার পাশে রয়েছে বাণিজ্যিক উলুখড়ের ক্ষেত। পাশেই রোপণ করা হয়েছে পুষ্টিকর গোখাদ্য পাকচং ও লাল নেপিয়ার ঘাসের চারা। দ্রুত বর্ধনশীল এই ঘাস তরতরে করে বেড়ে উঠছে। এখানেই দেখা মেলবে কবুতর ঘরে বসবাসরত কপোত কপোতির বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে মাতামাতির প্রেমলীলা, মুরগির ঘরে মোরগ মুরগি, পাশের ঘরে কয়েল পাখি ইত্যাদি। বাড়ির পশ্চিম দিকে বিনা পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা বাঁশ বাগানের পাশেই রয়েছে ভেষজ বাগান, আমন ধান খেত, স্থায়ী ফুল বাগান ও দুষ্প্রাপ্য ফলদ বাগান। এসব বাগানে রয়েছে শত শত জীবন্ত সব ফলদ বনজ ও ভেষজ বৃক্ষের সমাহার। ধান খেতে আধুনিক ধান চাষের সকল প্রযুক্তি সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে; এসব প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে লাইন, লগো, পারচিং, এডাব্লডি,আলোক ফাঁদ, ধানের আইলে সবজি চাষ ইত্যাদি। মডেল খামারবাড়ির পেছেন মূল খামারবাড়ির সীমানা প্রাচীরের বাইরে পরিত্যক্ত ফলের ক্রেট ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে উলম্ব পদ্ধতিতে দেয়ালে সবজি চাষ। ছাদ কৃষির পাশাপাশি এখানে চালু করা হয়েছে দেয়াল কৃষি।

এই মডেল খামারবাড়ির বিশেষত্ব হলো এখানে রোপিত প্রতিটি গাছ গাছালির সবজির বাংলা নাম, ইংরেজি নাম, বৈজ্ঞানিক নাম ও সেটার কিছু বৈশিষ্ট্য ছাপার হরফে দৃশ্যমান করে লেখা আছে প্রতিটি ফল ও সবজি গাছের পাশে রক্ষিত বিশেষ মেটালিক নামফলকে। সবই জীবন্ত তবে গাছপালা ও ফলফলাদির বৃক্ষরাজি লাগানো হয়েছে কম দূরত্বে এবং এগুলোর নিয়মিত অঙ্গ ছাঁটাই করে গাছগুলো দর্শকনন্দিত করা হয়েছে, কারণ এটি একটি মডেল মাত্র, তাই এখানে অনেক কম জায়গাতে অনেক বেশি প্রযুক্তির সমন্বয় করা হয়েছে। অধিকন্তু বাড়ির চারপাশে ডামি আকারে দেখানো কম্পোস্ট তৈরি, ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি, গরু মোটাতাজাকরণ প্রযুক্তি, লাকড়ি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব দেশি চুলা, বায়োগ্যাস প্লান্ট, বীজ সংরক্ষণাগার, সেনেটারি ল্যাট্রিন, আর্সেনিক মুক্ত সবুজ টিউবওয়েল ইত্যাদি। মডেল খামারবাড়ির মূল কমপ্লেক্সের বাইরে বড় বড় অনেকগুলো ডিসপ্লে বোর্ডে শোভা পাচ্ছে আধুনিক লাগসই টেকসই কৃষির আশা জাগানিয়া খবরা খবর। এখন পথচারীদের মূল আকর্ষণ হলো ‘মডেল খামারবাড়ি’।

মডেল খামারবাড়ির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা জানতে চাইলে ড. জামান বলেন, অনলাইনে বিজ্ঞপ্তি দেখে মডেল খামারবাড়ির ওপর একটি লেখা তিনি থাইল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন। তারা কয়েক স্তরে চুলচেরা যাচাই বাছাই ও বিশ্লেষন করে তার স্বীকৃতি দেন। তার এই মডেল খামারবাড়ী আগামী ২২ আগস্ট আন্তর্জাতিক করফারেন্সে তাকে উপস্থাপন করতে হবে। তার এই স্বীকৃতিতে তিনি ভীষণভাবে উৎসাহিত এবং ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় তাকে ব্যাংকক যাবার জন্য অনুমতি দিয়েছে।