কেমন আছে নারীরা ? - কামরুন নাহার পারভীন

কেমন আছে নারীরা ? - কামরুন নাহার পারভীন
বিশ্ব নারী দিবস কাল, কেমন আছে নারীরা ? - - কামরুন নাহার পারভীন

“আমরা কন্যাসন্তান হিসাবে মিষ্টি, আমরা বোন হিসাবে যত্নবান, আমরা প্রেমিকা হিসাবে সুন্দরী, আমরা স্ত্রী হিসাবে প্রিয়তমা, আমরা মা হিসাবে পরম মমতাময়ী, আমরা শক্তির আধার, আমরা নারী”।

কেমন আছে নারীরা? ১৯১১ সালে ঘোষিত ৮ ই মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ১৯১৪ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে পালন হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও সাড়ম্বরে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। সুদীর্ঘ কাল থেকে শুরু হওয়া নারী অধিকার আন্দোলনে কোন অবস্থানে বাংলাদেশ? নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে আলাদা কোন বিষয় নয়। তারপরও মানবাধিকারের যে বিষয়টি নিয়ে সারাবিশ্বে আলোচিত হয়, তা হলো নারী অধিকার। নারী অধিকার আদোয়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘে নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ সনদ, ১৯৭৯Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination Against Women, 1979 (CEDAW 1979), একে International Bill of Rights of Women ও বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সংবিধান নারী অধিকারের এক অনন্য স্বীকৃতি। সেখানে নারীকে কোন প্রকার বৈষম্যের শিকার বানানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮(১),(২),(৩), (৪), ২৯((১),(৩), ৬৫(৩),(৯) নারী অধিকার বিষয়ে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের সংবিধানের বিশ্বস্ত কোন নাগরিক নারীর প্রতি কোন বৈষম্য ও অন্যায় আচরণ করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি নারী উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ বিবেচনায় যে কোন উদ্যোগকেও সংবিধান সমর্থন করে। নারী ও শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা দমনে ১৯৮৩ সালে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়। নারী নির্যাতন বন্ধে এই আইন তেমন ভূমিকা রাখতে না পারায় ১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন পাস করা হয়। পরবতীতে এই আইনটি বাতিল করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ প্রণয়ন করা হয়। আইনটিকে আরো উপযোগী করতে ২০০৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া এসিড-সন্ত্রাস দমন আইন ২০০২ ও যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন ১৯৮০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ প্রভৃতি আইন প্রনয়ন করা হয়। বাল্য বিবাহের ভয়াবহতা বন্ধে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ ও পরবর্তি বছরে বাল্য বিবাহ নিরোধ বিধিমালা ২০১৮ প্রনীত হয়। এ ছাড়া দেশে প্রথমবার জাতীয় নারী নীতি আইন প্রণয়ন করা হয় ১৯৯৭ সালে, এরপর ২০০৪ ও ২০০৮ সালে তা সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালে পুনরায় নারী নীতি প্রণয়ন করা হয়।

এত আইনও বিধিমালার পরও থেমে নেই নারীর প্রতি নির্যাতন ও বৈষম্য। পারীবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রে যে কোন ঘটনার ভিকটিম হচ্ছে নারীরা। যদিও দাবী করা হয় নারী অগ্রযাত্রায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারীদের অবস্থান অনেক অগ্রগামি। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, করোনা মহামারী মোকাবেলায় ৭০ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে, ৮০ শতাংশ নারী পোষাক শিল্পে নিয়োজিত। তাছাড়া ক্ষমতায়নের অন্যান্য ক্ষেত্র- যেমন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগে নারীর পদচারণা উল্লেখযোগ্য ৷ নারী সেনা উচ্চপদস্ত পুলিশ কর্মকর্তা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করে দেশের সুনাম অক্ষুন্ন রেখেছে ৷ তাছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, নারী বিচারপতি, সচিব, ডেপুটি গভর্নর, রাষ্ট্রদূত, , জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার হিসেবে পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করে নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমান রেখে চলেছে।

নারীদের অবস্থাগত পরিবর্তন দৃশ্যমান। অবস্থান গত দিক বিবেচনা করলে এখনো নারীদের মত প্রকাশের অধিকার, সমতার অধিকার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, মজুরি বৈষম্য, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা সহ নিরাপদ চলাফেরার অধিকার যে পর্যায়ে ছিল সেই পর্যায়ে রয়ে গেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২০' অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম ৷ এ সূচকে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ এগুলো হচ্ছে: (ক) অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সুযোগ; (খ) শিক্ষাগত অর্জন; (গ) স্বাস্থ্য এবং বেঁচে থাকা; (ঘ) রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ৷

সমাজের সর্বস্তরে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতা অর্জন করতে হলে চারটি সূচকে  ভালো অবস্থানে থাকতে হবে। জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো বেশী কাজ করতে হবে।

“ ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সারা দেশে ২০২১ সালে ঘটে যাওয়া নারী নির্যাতনের  পরিসংখ্যান তৈরি করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদ এবং এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ৩ ডিসেম্বর,২০২১ গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে সংস্থাটি।

তথ্য মতে, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে ৩ হাজার ৭০৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৩৫ জন। এছাড়া ১৪টি কন্যাশিশুসহ ৩৩ জন শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন। আর ৬২টি কন্যাশিশুসহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৯৫ জন। একই সময়ে ৫৮টি কন্যাশিশুসহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন। ৩২টি কন্যাশিশুসহ ৪৬ জনকে উত্ত্যক্ত করার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে একটি কন্যাশিশুসহ উত্ত্যক্ত হওয়ার কারণে আত্মহত্যা করেছেন দুই জন। এছাড়া ৪৩টি কন্যাশিশুসহ ১২১ জনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে গত বছরে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার ঘটনা ঘটেছে চারটি। পাঁচটি কন্যাশিশুসহ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ১১ জন।  ১১৪টি কন্যাশিশুসহ ৪৪৪ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে।

এছাড়াও ১৯টি কন্যাশিশুসহ ৮৭ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৩১টি কন্যাশিশুসহ ৪২৭ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে গত বছর। এছাড়াও ১৩টি দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে ১১৭টি বাল্যবিয়ের তথ্য পাওয়া গেলেও বিদায়ী বছরে বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে ৩২৭টি। এর মধ্যে মাত্র ৪৩টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা গেছে।

১৫৩টি কন্যাশিশুসহ এ বছর অপহরণের শিকার হয়েছেন ১৮০ জন। এছাড়াও আটটি কন্যাশিশুসহ ১১ জনকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। ছয়টি কন্যাশিশুসহ ৪২ জন নারী ও কন্যাশিশু পাচারের শিকার হয়েছেন। এসব সংবাদ অনুযায়ী গত বছর দুই জনকে পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়েছে।

মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে পাঁচটি কন্যাশিশুসহ এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছেন ২২ জন। এর মধ্যে এসিডদগ্ধ হয়ে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছেন তিনটি কন্যাশিশুসহ ২৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১০ জন।

এছাড়াও প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখানের কারণে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে চারটি। ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে দুইটি। এ বছর ২৩টি কন্যাশিশুসহ ৬৩ জন সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন। এছাড়াও ২৬ জন নারী ও কন্যাশিশু অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।  ( তথ্য সুত্র :সারা বাংলা ৩ জানুয়ারী ২০২২) “।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ ডিসেম্বর ২০২১ ‘বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন’ এবং‘বেগম রোকেয়া পদক-২০২১’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি’র ভাষণে বলেন,“ আইন নয়, মানসিকতার পরিবর্তনই নারীর ওপর সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পারে।  তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা আমাদের জন্য পীড়াদায়ক তা হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন করেছি। কিন্তু, শুধু আইন করল্ইে এ সব বন্ধ করা যাবে না, এ জন্য মানসিকতাও বদলাতে হবে। চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন আনতে হবে।

“তাঁরা চায় মুক্ত আকাশ, তাঁরা চায় উড়তে।
ডানার দাবি তাঁরা জানায় না কখনও, কারণ ইচ্ছেশক্তি তাঁদের রক্তে।”

লেখক- প্রাবন্ধিক, সমাজ ও  উন্নয়ন কর্মী ।