নতুন সংকটে কাঁচা চামড়া

পোস্টকার্ড প্রতিবেদক ।।

নতুন সংকটে কাঁচা চামড়া
নতুন সংকটে কাঁচা চামড়া

সরকারের অনুরোধে ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিলেও আড়তদাররা বেঁকে বসেছেন। তারা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া শত শত কোটি টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তারা চামড়া বিক্রি করবেন না। আবার কাঁচা চামড়া রফতানির সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই অবস্থায় পাটজাত পণ্য ও কৃষি খাত বিশেষ করে ধানের ব্যবসার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি পণ্য চামড়া নিয়ে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এ শিল্পটিও বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বরাবরের মতো এবারও সরকার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। তবে মাঠের চিত্র ছিল ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন স্থানে আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী সেই চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন কিংবা ফেলে দেন। চট্টগ্রাম, সিলেট, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এই সংকটের মধ্যেই আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি না ঘোষণা দেওয়ায় সংকট নতুন মাত্রা পেল।

বাংলাদেশে চামড়াজাত দ্রব্য তৈরি করতে ট্যানারিগুলোতে চামড়ার যে চাহিদা, তার বড় অংশই মেটে ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া পশু থেকে। কোরবানির পশুর চামড়া মূলত কেনেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া যায় আড়তগুলোতে। সেখান থেকে চামড়া কেনেন ট্যানারি মালিকরা। এবার কাঁচা চামড়ার দর দেখে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ চামড়া সড়কে ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটালে তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। পরিস্থিতি দেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি গতকাল শনিবার থেকে চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানায়, তাতে সাড়াও মেলে।

গতকাল শনিবার বৈঠক করে কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া শত শত কোটি টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তারা চামড়া বিক্রি করবেন না। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, সরকারের অনুরোধে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী তারা (গতকাল) শনিবার থেকে কাঁচা চামড়া কিনতে তৈরি হলেও আড়তদাররা বিক্রি না করলে তাদের কিছু করার নেই।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বিগত ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে যে পাওনা টাকা রয়েছে, তা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নতুন ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেব না। মিটিংয়ে সবাইকে বারণ করা হয়েছে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে। রোববার (আজ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে দেলোয়ার একজন আড়তদারের পাওনার হিসাব তুলে ধরে বলেন, তিনি সাতটি ট্যানারির কাছে ১ কোটি টাকারও বেশি টাকা পাওনা রয়েছেন। একটি ট্যানারির কাছে ৪৪ লাখ ৬৬ হাজার, আরেকটি ট্যানারির কাছে ২৪ লাখ ৯৫ হাজার, আরেকটি ট্যানারির কাছে ২৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা পাওনা। এভাবে ৫ লাখ ৫ হাজার, ৯ লাখ ৮০ হাজার, ৩ লাখ ৭২ হাজার এবং ১১ লাখ টাকা করে পাওনা থাকার তথ্য অ্যাসোসিয়েশনকে জানিয়েছেন। কেবল ঢাকার লালবাগের পোস্তার ব্যবসায়ীরাই ট্যানারি মালিকদের কাছে অন্তত ১০০ কোটি টাকা পান জানিয়ে তিনি বলেন, সেই হিসাবে সারা দেশে অন্তত ৪০০ কোটি টাকার উপরে বকেয়া রয়েছে।

কাঁড়া চামড়া ব্যবসায়ীদের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশেনের কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বলেন, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কয়েকজন ট্যানারি মালিক পোস্তা এলাকায় চামড়া কিনতে গেছেন। এখন বিক্রি করা না করা সম্পূর্ণ তাদের এখতিয়ার।

কাঁচা চামড়া রফতানির করতে প্রস্তুত কি-না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এখনো ভাসা ভাসা কথার ওপরে আছি। লিখিত কোনো নির্দেশনা পাইনি। আমাদের রফতানির লাইসেন্স প্রয়োজন। যেসব দেশ কাঁচা চামড়া নেই, তাদের সঙ্গে আলাপ করা প্রয়োজন। ক্রেতা খুঁজতে হবে। অনেক প্রক্রিয়া আছে সেগুলো করতে হবে। আমাদের জিম্মি করে তারা ব্যবসা করতে চাচ্ছে। সেই জিম্মি দশা থেকে বের হওয়ার একটা সুযোগ আমরা পেয়েছি। তারা যদি টাকা দেওয়ার একটা প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আগামী দিনে ব্যবসা কীভাবে হবে সেটা নিয়ে আলোচনা করে, তবেই অচলাবস্থার অবসান হবে।

চামড়া নিয়ে এমন পরিস্থিতি হবে তা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন কি-না—সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা আগে থেকে এমন ধারণা করতে পারিনি। এদিকে, সংগৃহীত চামড়া রফতানি প্রক্রিয়া মোটেও সহজ নয় বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কারণ কাঁচা চামড়া রফতানি করতে যেসব লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার তা এ মুহূর্তে নেই।

তিনি বলেন, শুধু অনুমতি পেলে চামড়া রফতানি করা যায় না। কাঁচা চামড়া নেওয়ার জন্য নিদিষ্ট কন্টেইনার থাকতে হবে। রফতানি বাজার তৈরি করতে হবে। এলসি করতে হবে। এছাড়াও সাপোর্টিং অনেক ব্যাপার আছে। এগুলো সমন্বয় করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে এ মুহূর্তে কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ নেই। আবার দেরি করে কাঁচা চামড়া রফতানি করলে এর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। শাহীন আহমেদ বলেন, কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ দিলে শতভাগ দেশীয় এই শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। তিনি মনে করেন, আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার যদি দুই থেকে তিন মাস আগে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিত তাহলে গরিব-মিসকিন, এতিম ও দুস্থরা ঠকত না। গরিব-মিসকিন, এতিম ও দুস্থরা সুবিধাবঞ্চিত হতোনা ।