গ্রেপ্তার আতঙ্কে ডিআইজি পার্থের সহযোগীরা

৮০ লাখ টাকার বৈধ উৎস পায়নি দুদক

গ্রেপ্তার আতঙ্কে ডিআইজি পার্থের সহযোগীরা
গ্রেপ্তার আতঙ্কে ডিআইজি পার্থের সহযোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

চট্টগ্রামের সাবেক ডিআইজি প্রিজন্স ও বর্তমান সিলেট বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ গোপাল বণিককে ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেফতারের ঘটনায় কারা সেক্টরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ পন্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন এবং অর্থ পাচারে মানি লন্ডারিং আইনে মামলায় আদালত গতকাল সোমবার তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। 

এ ঘটনায় সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে দুদক জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে। 

এদিকে পার্থ গোপাল বণিককে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই কারা সেক্টরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের হাঁক ডাক কমে গেছে। কারা অধিদপ্তর থেকে শুরু করে কারা সেক্টরের স্পর্শকাতর শাখাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। অনেকে অফিসে এসে দায়সারা গোছের কাজ করছেন। অনেকে হাজিরা দিয়ে চলে গেছেন। তাদের চোখে মুখে রয়েছে আতঙ্কের ছাপ। গতকাল কারা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন শাখায় গিয়ে এমন দৃশ্য ধরা পড়ে। 

তবে এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।  

অভিযোগে জানা যায়, গত ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর নগদ ৪৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ও প্রায় ৫ কোটি টাকার নথিপত্রসহ ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস। গ্রেপ্তারের পরপরই পুলিশের কাছে জেলার সোহেল রানা দাবি করেন, উদ্ধার করা টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা তার এবং বাকি ৩৯ লাখ টাকা পার্থ গোপাল বণিক ও চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত গোপাল বণিকের।

এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি জানতে পেরেছে, ওই টাকা উদ্ধারের ঘটনায় যাঁরা দোষী বলে চিহ্নিত হয়েছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অন্য কর্মস্থলেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। 

তদন্ত কমিটি সোহেল রানার গ্রেপ্তারের পর বদলি হওয়া তৎকালীন ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক (বর্তমানে সিলেটে কর্মরত) এবং জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে (বর্তমানে বরিশালে কর্মরত) বিভিন্ন অনিয়মের জন্য দায়ী করেন। সোহেল রানার পাশাপাশি পার্থ গোপাল বণিক ও প্রশান্ত কুমার বণিকের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অনুসন্ধানের সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সোহেল রানার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া টাকা চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষের তৎকালীন ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক এবং জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে ঢাকায় হস্তান্তরের কথা ছিল।

এ ঘটনায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবহেলায় জড়িত ব্যক্তিরা হলেন চট্টগ্রাম কারাগারের তখনকার ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ গোপাল বণিক (বর্তমানে কারাগারে), জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক, জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরী, জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস, ডেপুটি জেলার মুহাম্মদ মুনীর হোসাইন, ফখর উদ্দিন, আতিকুর রহমান, মুহাম্মদ আবদুস সেলিম, হুমায়ন কবির হাওলাদার, মনজুরুল ইসলাম, সৈয়দ জাবেদ হোসেন, সহকারী সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, ফার্মাসিস্ট রুহুল আমিন, রামেন্দু মজুমদার পাল, কর্মচারী লায়েস মাজহারুল হক। 

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারণ কারা ক্যান্টিন। এর সঙ্গে আছে বন্দি বেচাকেনা, জামিন বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য। কারা হাসপাতাল ও ওয়ার্ডে টাকার বিনিময়ে বন্দি বিক্রি হয়ে থাকে। তদন্তে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে এসব অনিয়ম জেলার এবং জ্যেষ্ঠ জেল সুপারদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত হয়েছে। সেখানকার তৎকালীন ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক এসব অনিয়মের বিষয়ে জানলেও নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হিসেবে ব্যবস্থা না নিয়ে তিনি বরং আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন।

জানা গেছে, কারা ক্যানটিনের দায়িত্ব কারারক্ষীদের মধ্যে বণ্টনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৪০-৫০ লাখ টাকা কথিত নিলামে তোলা হয়। এই টাকা জেলার, জেল সুপার এবং ডিআইজিরা ভাগ–বাঁটোয়ারা করে নেন। জেলার, জেল সুপার, ডিআইজি তাঁদের নিজেদের মনোনীত কারারক্ষীদের মধ্যে কথিত নিলামের মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টন করেন। নগদ টাকায় ক্যানটিনের মালামাল বন্দিদের মধ্যে বিক্রয় করা হয়। কারারক্ষী, জেলার, জেল সুপার এবং ডিআইজিকে অবৈধ অর্থ দিতে কারা ক্যানটিনের পণ্যের দাম বন্দিদের কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি নেওয়া হয়। নগদ টাকায় বিক্রি করে যে লাভ পাওয়া যায়, সে টাকা প্রতি মাসে জেলার, জেল সুপার এবং ডিআইজির মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।

কারা সূত্র বলেছে, অনিয়ম এ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের বিষয়টি ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। চট্টগ্রামের আগে পার্থ গোপাল বণিকের বিরুদ্ধে যশোরে থাকাকালে ২১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলাও হয়েছিল। 

এ বিষয়ে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মো. ইকবাল হাসান বলেন, আমরা অভিযুক্তদের ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে, বাকিদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এদিকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিকের বাসা থেকে উদ্ধার করা ৮০ লাখ টাকার বৈধ উৎস পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার দুপুরে দুদকের সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কারাগারে (পার্থ গোপাল বণিকের আগের কর্মস্থল) দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। উদ্ধারকৃত টাকার বিষয়ে তিনি (পার্থ) স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তা জব্দকৃত টাকার বৈধ উৎস খুঁজে পাননি। তার (পার্থ) বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, মানি লন্ডারিং ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে মামলা হয়েছে। 
 
উল্লেখ্য, রোববার বিকালে ধানমণ্ডির ভূতের গলিতে পার্থ গোপাল বণিকের ফ্ল্যাট থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করে দুদক। এরপরেই তাকে আটক করা হয়। আটকের সময় পার্থ গোপাল বণিক দাবি করেন, ৮০ লাখ টাকা তার বৈধ আয় থেকে অর্জিত। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকা শাশুড়ি দিয়েছেন। বাকি ৫০ লাখ টাকা তার সারাজীবনের জমানো অর্থ।

অন্যদিকে, অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া দুদকের পরিচালক মুহাম্মদ ইউছুফ বলেছেন, পার্থ গোপাল বণিকের ঘোষিত আয়কর ফাইলে এ টাকার ঘোষণা নেই। তাই আমাদের মনে হয়েছে, এই টাকা অবৈধ আয় থেকে অর্জিত।

পার্থ গোপাল বণিক ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট চট্টগ্রাম কারাগারে ডিআইজি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর নগদ ৪৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ও প্রায় ৫ কোটি টাকার নথিপত্রসহ ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস। 

সুত্রঃ দৈনিক জাগরণ