একদিনেই সাগরে ডুবল ৫ জাহাজ , হেলিকপ্টারে অভিযান ।। ২১ নাবিক উদ্ধার, নিখোঁজ ৩

হাসান আকবর ।।

একদিনেই সাগরে ডুবল ৫ জাহাজ ,  হেলিকপ্টারে অভিযান ।। ২১ নাবিক উদ্ধার, নিখোঁজ ৩
একদিনেই সাগরে ডুবল ৫ জাহাজ , হেলিকপ্টারে অভিযান ।। ২১ নাবিক উদ্ধার, নিখোঁজ ৩

উত্তাল সাগরে একদিনেই ডুবল পাঁচটি লাইটারেজ জাহাজ। এসব ঘটনায় ২১ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ১১ জন এবং নৌ বাহিনী ১০ জনকে উদ্ধার করেছে। তবে তিনজন নাবিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের খুঁজতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড অভিযান শুরু করেছে।
এদিকে জাহাজডুবির ঘটনায় বিমানবাহিনী গতকাল প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। এর আগে বাংলাদেশে হেলিকপ্টারযোগে কোনো নাবিক উদ্ধারের ঘটনা নেই। ফলে বিশেষায়িত এই হেলিকপ্টারের ব্যবহার দেশের নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরে বঙ্গোপসাগর হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে। এ সময় পাহাড়সম ঢেউ একের পর এক এসে আঘাত করতে থাকে জাহাজগুলোতে। এর মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টায় আবুল খায়ের গ্রুপের মালিকানাধীন শাহ সিমেন্টের প্রায় দুই হাজার টন ক্লিংকারবাহী লাইটারেজ জাহাজ এমভি টিটু-১৯ ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। জাহাজটি সন্দ্বীপ থেকে ১৮ মাইল দূরে গভীর সাগরে প্রচণ্ড ঢেউয়ের কবলে পড়ে এর একটি হেজের ঢাকনা উড়ে যায়। ফলে জাহাজে ঢেউয়ের পানি ঢুকতে শুরু করে। এসময় জাহাজটি রক্ষা করা সম্ভব হবে না দেখে মাস্টার চরের দিকে চলতে থাকেন। তবে তীব্র ঢেউ কাটিয়ে চরের কাছাকাছি পৌঁছলেও জাহাজটি ডুবতে থাকে। এ সময় জাহাজের ১৪ নাবিকের সকলেই ছাদে উঠে যান। জাহাজের মাস্টারও তাদের উদ্ধার করতে বিপদ সংকেত দেন। এক পর্যায়ে সমুদ্রের ঢেউ তিন নাবিককে ছাদ থেকে ছিটকে ফেলে দেয়।
এদিকে জাহাজ থেকে পাঠানো সংকেত বাংলাদেশ নৌবাহিনী রিসিভ করে। তারা বিষয়টি সাথে সাথে বিমানবাহিনীকে জানায়। বিমানবাহিনী তাদের বহরে থাকা এ-ডব্লিউটি-১৩৯ মডেলের বিশেষায়িত হেলিকপ্টার নিয়ে বঙ্গোপসাগরে উদ্ধার অভিযান চালায়।
বিমানবাহিনী সূত্র জানায়, গতকাল এমভি টিটু-১৯ জাহাজের নাবিকদের উদ্ধারে দুটি এ-ডব্লিউ-১৩৯ মডেলের হেলিকপ্টার সাগরে যায়। হেলিকপ্টার দুটির একটিতে ছয়জন এবং অপরটিতে পাঁচজন নাবিককে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়েছে। উদ্ধার ১১ নাবিকের মধ্যে রয়েছেন, জাহাজের মাস্টার ফিরোজ খান, ড্রাইভার সিদ্দিকুর রহমান, নাবিক শায়েস্তা, ইকবাল, মেহেদী ইসহাক প্রমুখ। গতরাতে আবুল খায়ের গ্রুপের কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের নিকট তাদের হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে জাহাঙ্গীর, কালাম ও অপর একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের খোঁজে গতরাতেই বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পেট্রোল জাহাজ এলপিটি শ্যামল বাংলা গভীর সাগরে যাত্রা করেছে। আজ হেলিকপ্টারগুলোও অভিযানে যাবে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বিশেষায়িত হেলিকপ্টার এডব্লিউটি-১৩৯ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যোগ হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। এই তিন বছরে হেলিকপ্টার দুইটি আগে দুয়েকবার সাগরে গেলেও এর আগে কোনো দিন দুর্ঘটনা কবলিত নাবিকদের উদ্ধার করেনি। গতকাল দেশের নৌ দুর্ঘটনার উদ্ধার কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যে কোনো নৌ দুর্ঘটনার শিকার মানুষ নদী বা সাগরে অনেকক্ষণ ভাসমান থাকতে পারেন। এক পর্যায়ে পানি খেয়ে ডুবে যান। দুর্ঘটনার পরপর হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার অভিযানে যাওয়া সম্ভব হলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সেই প্রাণরক্ষার মিশনে ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অপরদিকে শাহ সিমেন্টের ক্লিংকার বোঝাই এমভি টিটু-১৮ ও এমভি টিটু-১৬ নামে আরো দুটি জাহাজ গতকাল ডুবে গেছে বলে জানা গেছে। খবর পেয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ দুর্জয়, শৈবাল, সুরভি ও সোয়াডস ১০ জন নাবিককে উদ্ধার করেছে। শাহ সিমেন্টের লাইটারগুলো ঢাকার মুক্তারপুরে শাহ সিমেন্ট কারখানা ঘাটে যাওয়ার কথা ছিল।
এদিকে গতকাল হাতিয়ার কাছে এমভি টপ শিপ নামের অপর একটি লাইটার জাহাজ ডুবে গেছে। দেশ ট্রেডিংয়ের মালিকানাধীন জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে ডিএপি সার নিয়ে নোয়াপাড়া যাচ্ছিল। এগারশ’ টন ধারণক্ষমতার জাহাজটিতে এক হাজার টনেরও বেশি সার ছিল বলে সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া মিশু মাওয়া নামে একটি লাইটার জাহাজ সাহারাবিকন নামক স্থানে ডুবে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। তবে জাহাজ দুটির নাবিকদের কাছাকাছি থাকা অন্য জাহাজের নাবিকরা উদ্ধার করেছেন বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গতকাল নাবিক উদ্ধারে যাওয়া অগাস্টা ওয়েস্টল্যান্ড-১৩৯ হেলিকপ্টারটি ১৫ জন যাত্রী পরিবহনে সক্ষম। ২০০১ সালে প্রথম আকাশে ডানা মেলা এই ধরনের ৯০০টিরও বেশি হেলিকপ্টার রয়েছে বিশ্বে। দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট প্রতিটি হেলিকপ্টারের দাম প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার বা একশ’ কোটি টাকারও বেশি বলে জানা গেছে।

আজাদী