অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য কমছে না

তিন মাসে খপ্পরে পড়েছে ৪৪ জন ঈদুল আজহায় যাত্রাপথে সতর্ক থাকার পরামর্শ

অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য কমছে না
অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য কমছে না

সোহেল মারমা । কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান পার্টির ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষের সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এক হিসাবে, গত তিন মাসে চক্রটির কবলে পড়ে অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে অন্তত ৪৪ জন ভর্তি হয়েছেন। পুলিশের কঠোর নজরদারি ও অভিযানের পরও অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না।
সম্প্রতি থানা পুলিশ ও ডিবির পৃথক অভিযানে চক্রের ১২ সদস্যকে আটকের পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে অজ্ঞান কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ চেতনা নাশক পাউডার, ডরমিটল ও সেডিল ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। এদের মধ্যে কোতোয়ালী থানায় গ্রেপ্তার হওয়া একটি চক্রের সদস্যের ব্যাপারে পুলিশ বলছে, গত ১০ বছরে চক্রটি ৮০০ মানুষকে অজ্ঞান করার ঘটনার সঙ্গে জড়িত। পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এরপরও থামছে না চক্রটির দৌরাত্ম্য।
চমেক পুলিশ ফাঁড়ির তথ্যে জানা গেছে, গত মে মাসে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে দুজন চমেক হাসপাতালে ভর্তি হন। পরের মাস থেকে এই ধরনের রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে জুনে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়া ১৫ জন রোগী ভর্তি হন। জুলাইয়ে ২৪ জনকে নগরীসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চলতি মাসে গতকাল পর্যন্ত ৬ দিনে ৫ জন মলম পার্টির ফাঁদে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
পুলিশের তথ্যে জানা যায়, ওই সময়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের প্রায় সবাই যাত্রী হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। পরবর্তীতে তাদের অজ্ঞান অবস্থায় রেলস্টেশন, বাস কাউন্টার, রাস্তার ধারে ও জনসমাগমপূর্ণ বিভিন্ন মার্কেটের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়। অনেকেই মোটা অংকের টাকা বহনের সময় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। ওইসব ব্যক্তির বেশিরভাগই উদ্ধার হয়েছেন কোতোয়ালী, আকবর শাহ, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন বাস ও রেলস্টেশনের আশপাশ থেকে। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে অসুস্থ অবস্থায় ৪০ বছর বয়সী একজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চান্দগাঁও থানার এএসআই মনিরুল ইসলাম বলেন, লোকটি বাস টার্মিনাল এলাকায় পড়েছিল। তিনি নিশ্বাস নিচ্ছিলেন, কিন্তু কথা বলতে পারছিলেন না। ওই অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কথা বলতে না পারায় তার বিস্তারিত পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।
একইদিন চকবাজারে অজ্ঞান পার্টি কবলে পড়ে এক রিকশা যাত্রীর নগদ টাকা, ঘড়ি ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই ব্যক্তি রিকশাযোগে যাওয়ার সময় চালক তাকে একটি ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লেখা নাম পড়ে শোনানোর অনুরোধ করেন। সেই প্যাকেটটি হাতে নিয়ে পড়ার পর ওই যাত্রী অচেতন হওয়ার অবস্থায় পড়েন। ওই মুহূর্তে তার সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় চক্রটি।
চমেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম বলেন, গত তিন মাসে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে যাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছেন, দুয়েকদিনের মধ্যে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর সুস্থ হয়ে তারা বাড়ি ফিরেছেন।
তবে, অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। গত ৭ জুলাই নতুন ব্রিজ ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে থেকে জোসনা বেগম (৬৫) নামে এক মহিলাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর দুলাল বনিক (৫০) নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ওইদিন রাতে নগরীর কাস্টমস মোড়ে একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধারের পর পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চমেক হাসপাতালে মারা যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বাসিন্দা দুলাল।
এমন অবস্থায় ঈদুল আজহা উপলক্ষে অজ্ঞান পার্টির চক্র থেকে বাঁচতে যাত্রাপথে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, যাত্রাপথে অপরিচিত কারো সঙ্গে সিএনজি বা অন্য কোনো যানবাহনে শেয়ারে না যাওয়ার, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে অপরিচিত কারোর খাবার গ্রহণ না করা, হকার বা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কোমল পানীয় ডাব, শরবত বা অন্য কোনো খাবার গ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া যাত্রাপথে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির সদস্য হিসেবে কাউকে সন্দেহ হলে তাদের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক ৯৯৯ নম্বরে কল করার জন্য বলা হয়।